
পিরোজপুরে দলিল জালিয়াতির ঘটনায় চাঞ্চল্য, আদালতে একাধিক মামলা চলমান
পিরোজপুরে মৃত চাচাকে নিজের পিতা হিসেবে দেখিয়ে ভুয়া দলিল তৈরি করে সম্পত্তি দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে মোঃ মানসুর শেখ নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি তার মৃত চাচা আঃ রাজ্জাক শেখকে নিজের পিতা মোঃ রাজে আলী শেখের সঙ্গে একই ব্যক্তি দেখিয়ে জাল দলিল তৈরি করেন এবং সেই দলিলের মাধ্যমে জমি দখলের চেষ্টা চালান।
সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র ও তদন্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, পিরোজপুর সদর উপজেলার আলমকাঠী গ্রামের বাসিন্দা সরব আলী শেখের দুই স্ত্রী ছিলেন। প্রথম স্ত্রী সোনা বিবির সন্তান ছিলেন মোঃ রাজে আলী শেখ, আঃ রাজ্জাক শেখ ও রহিমোন বিবি। দ্বিতীয় স্ত্রী বরুজান বিবির একমাত্র সন্তান আজিমোন বিবি।
পারিবারিক বিরোধের কারণে সরব আলী শেখ জীবদ্দশায় তার সম্পত্তি সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেন। লিখিত দলিলের মাধ্যমে আলমকাঠী মৌজার সম্পত্তি বড় ছেলে রাজে আলী শেখ ও মেয়ে রহিমোন বিবিকে এবং ব্রাহ্মণকাঠী মৌজার সম্পত্তি ছোট ছেলে আঃ রাজ্জাক শেখ ও মেয়ে আজিমোন বিবিকে প্রদান করা হয়। দলিল সম্পাদনের সময় আত্মীয়-স্বজনরাও সাক্ষী ছিলেন বলে জানা গেছে।
তবে ১৯৬২ সালের বিএস মাঠ জরিপের সময় অসুস্থতার কারণে রাজে আলী শেখের পরিবর্তে তার শ্যালক মোঃ মফিজ উদ্দিন মৃধা জরিপ কাজে অংশ নেন। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় ভূমি কর্মকর্তাকে লিখিত দলিল দেখানো হলেও আঃ রাজ্জাক শেখের মৃত্যুর বিষয়টি জানানো হয়নি। ফলে মৃত আঃ রাজ্জাক শেখের নামেও রেকর্ড অন্তর্ভুক্ত হয়।
পরবর্তীতে রাজে আলী শেখের ছেলে মানসুর শেখ পরিবারের ঘর থেকে লিখিত দলিলসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সরিয়ে নেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে তিনি তার পিতা রাজে আলী শেখকে দিয়ে বড় ভাই আবুয়াল শেখ ও নুরুল আমিন শেখের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করান।
অভিযোগ অনুযায়ী, মানসুর শেখ গোপনে একটি রেজিস্ট্রি দলিল তৈরি করেন, যেখানে দাতা হিসেবে “মোঃ রাজে আলী ওরফে আঃ রাজ্জাক শেখ” নাম ব্যবহার করা হয়। ২০০৪ সালের ৩০ আগস্ট দলিলটি রেজিস্ট্রি করা হয়। পরে পিরোজপুর আদালতে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে একটি এফিডেভিটের মাধ্যমে রাজে আলী শেখ ও আঃ রাজ্জাক শেখ একই ব্যক্তি—এমন দাবি উপস্থাপন করা হয়।
কিন্তু তদন্তে উঠে আসে, রাজে আলী শেখ ও আঃ রাজ্জাক শেখ দুই সহোদর ভাই এবং আঃ রাজ্জাক শেখ ১৯৬৩ সালের ১৭ মে মারা যান। পিরোজপুর পৌর তহসিলদার এমদাদুল হক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, “মোঃ রাজে আলী ওরফে আঃ রাজ্জাক শেখ” নামে কোনো একক ব্যক্তি নেই।
এছাড়া মানসুর শেখের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ব্যাংক হিসাব এবং তার নিজস্ব ক্রয়কৃত দলিলেও পিতার নাম মোঃ রাজে আলী শেখ উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২১১১ নম্বর সাব-কবলা দলিলের ভিত্তিতে করা একটি মামলাও খারিজ হয়ে যায়। আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, দলিলে “রাজে আলী ওরফে আঃ রাজ্জাক শেখ” নাম ব্যবহার করে শঠতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওই খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল না করায় অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) পিরোজপুর সদরের সরেজমিন তদন্তে জানা যায়, বিএস ৯১ খতিয়ানের রেকর্ডভুক্ত মালিক আব্দুর রাজ্জাক শেখের কাছ থেকে ২০০৪ সালের ৩০ আগস্ট ২১১১ নম্বর কবলা দলিলের মাধ্যমে ১ দশমিক ৬০ একর জমি ক্রয় দেখিয়ে মানসুর শেখের নামে ৬২৭ নম্বর খারিজ খতিয়ান খোলা হয়। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, দলিলের দাতা হিসেবে উল্লেখিত “মোঃ রাজে আলী ওরফে আঃ রাজ্জাক শেখ” একই ব্যক্তি নন।
বর্তমানে ওই দলিল বাতিলের দাবিতে পিরোজপুর সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে ৭৩/২০২৫ নম্বর দেওয়ানি মামলা এবং অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৫৮৫/২০২৪ নম্বর সিআর মামলা চলমান রয়েছে। উভয় মামলার বাদী মোঃ আবুয়াল শেখ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ঘটনা পিরোজপুরে ভূমি জালিয়াতির একটি গুরুতর উদাহরণ হিসেবে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
@thedailyjanomuktibarta

