
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এর কমিশনার মিয়ঁ মো. আবু ওবায়দার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ২২তম বিসিএস ক্যাডারের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন মো. আক্তারুজ্জামান। অভিযোগটির ট্র্যাকিং নম্বর ১৬২৮৮০২৪৪৬৫০০০১।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে সহকারী কমিশনার হিসেবে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে যোগদানের পর থেকে মিয়ঁ মো. আবু ওবায়দা ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। আইসিডি কমলাপুর, এনবিআর সচিবালয়, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) এবং বন্ডের প্রথম ও দ্বিতীয় সচিব পদে দায়িত্ব পালন করলেও তাকে দীর্ঘ সময়ে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়নি। দপ্তরের ভেতরে ধর্মীয় ভাবমূর্তির কারণে তিনি ‘বন্ড হুজুর’ নামে পরিচিত হলেও, অভিযোগ অনুযায়ী আড়ালে তিনি বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
কূটনৈতিক বন্ডে মাসিক কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ
লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে প্রতি মাসে প্রায় ২ কোটি টাকার ঘুষ আদায়ের একটি সিন্ডিকেট পরিচালিত হতো। ‘ফরিদ’ নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করা হতো বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, শুল্কমুক্ত পণ্য ও মদ আমদানির সুযোগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ডিপ্লোম্যাটিক ওয়্যারহাউসকে অবৈধ সুবিধা দেওয়া হতো।
এছাড়া ‘জামান অ্যাক্সেসরিজ’-এর মালিক জামানকে এই অর্থ লেনদেনের প্রধান সমন্বয়কারী বা ‘কালেক্টর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ভ্যাট বিভাগ থেকে এ.বি.এম মাসুম নামের এক কর্মকর্তাকে বিশেষভাবে এই কার্যক্রম তদারকির জন্য আনা হয়েছিল বলেও অভিযোগে বলা হয়।
ফটোকপির দোকানে জাল নথি তৈরির অভিযোগ
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ভ্যাট উত্তরের অতিরিক্ত কমিশনার থাকাকালে মিয়ঁ মো. আবু ওবায়দা অফিস ভবনের নিচতলায় মোস্তফা ফখরুদ্দিন নামের এক ব্যক্তিকে অবৈধভাবে ফটোকপির দোকান বরাদ্দ দেন। অনুসন্ধানে সেখানে একাধিক কম্পিউটার ও ফটোকপি মেশিন পাওয়া যায় এবং সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইমরান হাসানকে গুরুত্বপূর্ণ নথি প্রত্যয়ন করতে দেখা গেছে।
অভিযোগকারীর দাবি, এই দোকান থেকেই জাল নথি ও ভুয়া ইউটিলাইজেশন পারমিশন (ইউপি) তৈরি করে বন্ড রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর জাল করা হতো। এর মাধ্যমে মাহমুদ গ্রুপ ও ডংবেং গ্রুপের মোট সাতটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩৭৫ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি আড়াল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বাসায় সরকারি ফাইল সংরক্ষণ ও মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ
মো. আক্তারুজ্জামানের অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্ত কর্মকর্তা অফিসের গুরুত্বপূর্ণ গোপন নথি ব্যক্তিগতভাবে বাসায় সংরক্ষণ করতেন। পরবর্তীতে এসব ফাইলের তথ্য ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হতো বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে কমিশনার মিয়ঁ মো. আবু ওবায়দা বলেন, তাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যেই এসব অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এটি একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র এবং একটি বিশেষ মহল তার সম্মান ক্ষুণ্ন করতে কাজ করছে। তবে অভিযুক্ত সাতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে এবং ইতোমধ্যে সাতটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, ফটোকপির দোকানের মালিক মোস্তফা ফখরুদ্দিন জাল নথি তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার দোকানে কেবল ফটোকপি ও কার্টিজ সংক্রান্ত কাজ করা হয়। তিনি দাবি করেন, কোনো ধরনের জালিয়াতির সঙ্গে তিনি জড়িত নন।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
অভিযোগের গুরুত্ব এবং বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, পুরো ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

