সোমবার, মে ১৮, ২০২৬

এসপি পদে বদলির নামে ১৫ কোটি টাকার চুক্তির অ’ভিযোগ, আলোচনায় প্রভাবশালী চক্র

পুলিশ কর্মকর্তা ভাইকে পছন্দের জেলায় পদায়নের আশ্বাস দিয়ে ১৫ কোটি টাকার চুক্তি করার অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত এক বিচারকের স্ত্রীর সঙ্গে কৌশলে ‘জমিসংক্রান্ত লেনদেন’ দেখিয়ে এই চুক্তি করা হয়, যদিও মূল উদ্দেশ্য ছিল একজন এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ কিংবা রাজশাহীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় বদলি করানো।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এ ঘটনায় জড়িত হিসেবে নাম এসেছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক ফেডারেশনের সদ্য ঘোষিত কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন খান, পুলিশের বরখাস্তকৃত কনস্টেবল মো. জুয়েল এবং মাসুম রানা নামের এক ব্যক্তির।

জমি উদ্ধারের টোপ থেকে বদলি বাণিজ্য

ঘটনার সূত্রপাত রাজধানীর সাগুফতা এলাকায় অবস্থিত আড়াই কাঠা জমি নিয়ে। ভুক্তভোগী নারীর দাবি, জমিটি বেদখল হয়ে যাওয়ার পর উদ্ধারের আশায় প্রথমে তিনি কনস্টেবল জুয়েলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং অগ্রিম ৮ লাখ টাকা দেন।

পরে জুয়েল এককভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হলে শ্রমিক নেতা শাহাদাত হোসেন খানকে যুক্ত করা হয়। তাকে দেওয়া হয় আরও ২০ লাখ টাকা। এরপর মাসুম রানার মাধ্যমে আরও ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে জমি উদ্ধারের নামে প্রথম ধাপে ৩৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হলেও কোনো কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী।

ভুক্তভোগী নারী জানান, পরবর্তীতে অভিযুক্তরা তাকে নতুন প্রস্তাব দেয়। তারা দাবি করে, প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে তাদের যোগাযোগ রয়েছে এবং চাইলে তার ভাইকে গুরুত্বপূর্ণ জেলায় এসপি হিসেবে পদায়ন করানো সম্ভব।

১৫ কোটি টাকার ‘চুক্তিনামা’

অভিযোগ অনুযায়ী, পরে চার শর্তে একটি লিখিত চুক্তিপত্র তৈরি করা হয়। সেখানে সরাসরি বদলি বা পোস্টিংয়ের কথা উল্লেখ না করে বিষয়টিকে জমিসংক্রান্ত আর্থিক লেনদেন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

চুক্তিতে বলা হয়, ১৫ দিনের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করতে হবে। কাজ সফল হলে চেকের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হবে এবং ব্যর্থ হলে চুক্তিপত্র ফেরত দেওয়া হবে।

চুক্তির গ্যারান্টি হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংকের ছয়টি চেকের মাধ্যমে মোট ১৫ কোটি টাকার হিসাব দেখানো হয়। বিভিন্ন চেকে ৫ কোটি, ৩ কোটি, ২ কোটি এবং দেড় কোটি টাকার পরিমাণ উল্লেখ ছিল বলে জানা গেছে।

ভুক্তভোগী নারী দাবি করেন, এত বিপুল অর্থের বিষয়ে প্রশ্ন করলে চক্রটি তাকে জানায়, তারা নিজেরাই বিনিয়োগকারী খুঁজে বের করবে এবং পদায়ন সম্পন্ন হওয়ার পর অর্থ সমন্বয় করা হবে।

ভয়ভীতি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত কাজ না হওয়ায় টাকা ফেরত চাইলে ভুক্তভোগী নারীকে ভয়ভীতি দেখানো শুরু হয়।

হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো এক ভয়েস মেসেজে শ্রমিক নেতা শাহাদাত হোসেন খানকে বলতে শোনা যায়, “মিডিয়া বা অন্য কারও মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করলে আপনার ভাইয়ের ক্ষতি হবে। আমাদের যোগাযোগ প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে।”

আরেকটি অডিও রেকর্ডে তিনি গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলার পদায়ন নিয়ে আলোচনা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগী নারীর দাবি, পরবর্তীতে চক্রটি নিজেদের প্রভাবশালী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত দাবি করে তার বাসায় লোকজন পাঠানোর হুমকিও দেয়।

তিনি বলেন, “শেষ পর্যন্ত জমিও উদ্ধার হয়নি, ভাইয়ের বদলিও হয়নি। বরং প্রতারণার শিকার হয়েছি।”

অভিযুক্তদের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমিক নেতা শাহাদাত হোসেন খান বলেন, “আমি কোনো বিচারক বা তার স্ত্রীকে চিনি না। আমি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ এবং চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত আছি।”

বরখাস্তকৃত কনস্টেবল মো. জুয়েলও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি বদলি বাণিজ্য কিংবা ওই নারীর সঙ্গে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত নন।

অন্যদিকে মাসুম রানা জানান, জুয়েলের মাধ্যমে তার সঙ্গে ওই নারীর পরিচয় হয়েছিল। তিনি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কিছু টাকা ধার নেওয়ার কথা স্বীকার করলেও প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করেন।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের নাম ব্যবহার করে বদলি বাণিজ্য এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। পুরো ঘটনায় একটি সুসংগঠিত চক্র জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ কারণে বিষয়টি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

@durnitirdiary

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ