
শরীয়তপুর-চাঁদপুর আঞ্চলিক সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের নকশায় না থাকা কিংবা ভিডিও জরিপে শনাক্ত না হওয়া তথাকথিত স্থাপনার বিপরীতে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অথচ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৫১ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৩৫ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৬ কিলোমিটার অংশের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তিন দফা সময় বৃদ্ধি সত্ত্বেও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ১৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের বরাদ্দ শেষ হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত ৪১৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)।
সওজ সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার যানবাহনের সহজ যোগাযোগ নিশ্চিত করতে ২০০১ সালে চালু করা হয় চাঁদপুর-শরীয়তপুর আঞ্চলিক সড়ক। পরে সড়কটি সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে এটি প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। শরীয়তপুর শহরের মনোহর বাজার থেকে ভেদরগঞ্জ উপজেলার ইব্রাহিমপুর পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার সড়ক পুনর্নির্মাণে ৮৬০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৪৩০ কোটি টাকা জমি অধিগ্রহণ এবং বাকি অর্থ সড়ক নির্মাণে ব্যয়ের পরিকল্পনা ছিল।
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরে তা বাড়িয়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর এবং পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। তবে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় অধিকাংশ এলাকায় কাজ শুরুই করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে প্রায় ৪৭ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ এখনো বাকি রয়েছে।
সওজের শরীয়তপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ নাবিল হোসেন বলেন, প্রকল্পের ডিপিপিতে জমি অধিগ্রহণ ব্যয় কম ধরা হয়েছিল। ফলে জমি অধিগ্রহণ শেষ হওয়ার আগেই বরাদ্দ শেষ হয়ে যায়। এখন মেয়াদ বৃদ্ধির পাশাপাশি অতিরিক্ত ৪১৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
জমি অধিগ্রহণে ‘ভূতুড়ে বিল’ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা জমির ভিডিও ধারণের আগে ও পরে স্থানীয় একটি চক্র ফাঁকা জমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে এসব স্থাপনাকে বৈধ দেখিয়ে ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এলএ শাখার কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, ভিডিও জরিপে না থাকা কিংবা প্রকল্প নকশার বাইরে থাকা স্থাপনাগুলোর বিপরীতেও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। এমনকি ছোট গাছকে বড় গাছ হিসেবে দেখিয়ে অস্বাভাবিক অঙ্কের বিল প্রস্তুত করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণ নেওয়ার পর অনেক স্থাপনাই এখন আর অধিগ্রহণকৃত জমিতে দেখা যাচ্ছে না।
ভেদরগঞ্জ উপজেলার চরতারবুনিয়া মৌজায় শফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির জমিতে ভিডিও জরিপে একতলা ভবন দেখা গেলেও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সময় ভবনের দ্বিতীয় তলায় আধাপাকা টিনশেড ঘর দেখিয়ে অতিরিক্ত প্রায় ২০ লাখ টাকার বিল দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ ছাড়া পাপরাইল এলাকার জয়নাল খাঁর জমিতে গাছের সংখ্যা ও আকার বাড়িয়ে দেখিয়ে প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে জয়নাল খাঁ দাবি করেছেন, সবকিছু নিয়ম মেনেই হয়েছে।
২০১৭ সালের স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন অনুযায়ী অসৎ উদ্দেশ্যে নির্মিত স্থাপনা ক্ষতিপূরণের তালিকাভুক্ত করার সুযোগ নেই। কিন্তু আইন উপেক্ষা করে বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনার বিপরীতেও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সদর উপজেলার চরকাশাভোগ এলাকায় শাহিদা বেগম নামের এক নারী অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় নিজ জমিতে দুটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করেছিলেন বলে জানা গেছে। প্রথমে এলএ শাখা স্থাপনাগুলোকে জনস্বার্থবিরোধী উল্লেখ করে তালিকা থেকে বাদ দিলেও পরে আপত্তি নিষ্পত্তির মাধ্যমে তাঁকে প্রায় ৪৬ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, সড়ক প্রকল্পের অন্তত ১৯টি এলএ কেসে প্রায় ১২০টি আপত্তি যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়াই নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
এদিকে ক্ষতিপূরণ তুলতে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে এলএ শাখার বিরুদ্ধে। দক্ষিণ মধ্যপাড়া এলাকার আবদুল মালেক ফকির অভিযোগ করেন, ক্ষতিপূরণের ১৬ লাখ টাকার চেক তুলতে তাঁকে আড়াই লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন নান্নু সরদার নামের আরেক ব্যক্তি। তাঁর দাবি, ভ্যাটের কথা বলে ক্ষতিপূরণের টাকার ৬ শতাংশ কেটে নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাসুদুল আলম বলেন, তাঁর কাছে এ ধরনের কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। অন্যদিকে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যেন পারসেন্টেজ না নেন, সে বিষয়ে শুরু থেকেই কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ নাবিল হোসেন বলেন, ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়ে তাঁর কাছে এখনো কোনো অনিয়মের তথ্য আসেনি। তবে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে।

