
প্রাণ-আরএফএল সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ, ভুয়া নথি, নিম্নমানের সরঞ্জাম সরবরাহ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান শুরু
সরকারি চাকরির আড়ালে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের শের-ই-বাংলা নগর ৩ নম্বর উপবিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসডিই) মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সহযোগী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে হাজার কোটি টাকার টেন্ডার জালিয়াতি, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ভুয়া নথি ব্যবহার করে ইউরোপীয় ব্র্যান্ডের নামে নিম্নমানের ভারতীয় লিফট সরবরাহ, নকল ফায়ার পাম্প স্থাপন এবং একই প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন নামে টেন্ডারে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার শুক্তাগর ইউনিয়নের কাঠিরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মাসুম বিল্লাহ ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, বিতর্কিত মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে গণপূর্ত অধিদপ্তরে চাকরিতে যোগ দেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, চাকরিতে যোগদানের পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন মাসুম বিল্লাহ ও তাঁর পরিবার। রাজাপুরে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ, শতাধিক বিঘা জমি ক্রয় এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি কেনার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
এদিকে, ২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর তাঁর গ্রামের বাড়িতে সংঘটিত একটি ডাকাতির ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় আসে। স্থানীয়দের দাবি, ওই ঘটনায় বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার লুট হলেও থানায় তুলনামূলক কম পরিমাণ সম্পদ খোয়া যাওয়ার অভিযোগ দায়ের করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৬ সালে নগর গণপূর্ত বিভাগের স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে কমিশন গ্রহণ করতেন মাসুম বিল্লাহ। পরে বিভিন্ন বড় প্রকল্পে ভুয়া বিল-ভাউচার ও অগ্রিম বিল অনুমোদনের মাধ্যমেও কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি এসেছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে সরকারি ক্রয়ে অনিয়মের ঘটনায়। অভিযোগ অনুযায়ী, রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান ইউরোপীয় ‘Kone Lift’ সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে নিম্নমানের ভারতীয় লিফট সরবরাহ করেছে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্পে চুক্তিবদ্ধ মানসম্পন্ন ‘UL Listed’ ফায়ার পাম্পের পরিবর্তে নিম্নমানের নন-ইউএল পাম্প স্থাপনের অভিযোগও রয়েছে।
এছাড়া একই মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ভিন্ন বানান ও পৃথক TIN/BIN ব্যবহার করে ২১৩টি কার্যাদেশের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৬০ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সরকারি ক্রয়বিধি (PPR 2008) লঙ্ঘনের শামিল।
এই অনিয়মে গণপূর্ত অধিদপ্তরের আরও কয়েকজন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধে টেন্ডার অনুমোদন, নথি যাচাই ছাড়াই বিল পাস এবং নিম্নমানের পণ্যের ছাড়পত্র দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সচেতন নাগরিক মো. মিলন মৈত্রা দুদক চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে অডিট নথি, ডিভিএস যাচাই ও আরজেএসসি নিবন্ধনে অসংগতি তুলে ধরা হয়।
দুদক ইতোমধ্যে মাসুম বিল্লাহ, তাঁর ভাই শফিউল বসর এবং স্ত্রী নাইমা আক্তার সুমার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহারের অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় এ ধরনের অনিয়ম শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করে। তাই পুরো ঘটনায় স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

