রবিবার, এপ্রিল ২৬, ২০২৬

প্রতিমন্ত্রীর কাছে আবেদন, ৭ দিনেই ফিরে পেলেন পদ

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তবিবুর রহমান তালুকদারকে ৯ এপ্রিল সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অভিযোগ ছিল, তার বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে অনিয়ম ও দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া গেছে। এই আদেশ জারি করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান।

কিন্তু এই বরখাস্ত আদেশ বেশি দিন টেকেনি। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে পরিস্থিতি বদলে যায়। ১২ এপ্রিল তবিবুর রহমান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পুনঃতদন্ত করা হলে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হবেন। একই সঙ্গে মানবিক দিক বিবেচনায় তাকে পুনর্বহাল করার অনুরোধ জানান।

এই আবেদনের ওপর প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর সচিবের সঙ্গেও বিষয়টি আলোচনা হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

এরপর ২২ এপ্রিল আবার নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। একই সচিব স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী তবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ফলে তার সাময়িক বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার করে তাকে আগের পদে পুনর্বহাল করা হয়। এমনকি বরখাস্তকালীন সময়কেও চাকরির অংশ হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়।

সব মিলিয়ে ৯ এপ্রিল থেকে ২২ এপ্রিল—এই অল্প সময়ের মধ্যেই একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ, বরখাস্ত, পুনঃতদন্ত এবং আবার নির্দোষ ঘোষণা—পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে।

এই দ্রুত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ভেতরেই। অনেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কখন তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো, কারা ছিলেন, কীভাবে তদন্ত হলো—এসব বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। তদন্ত প্রতিবেদনও কোথাও পাওয়া যায়নি। অনেকের ধারণা, আদৌ কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়নি।

নথি বিশ্লেষণেও কিছু অসঙ্গতি দেখা গেছে। প্রথম প্রজ্ঞাপনে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা বলা হলেও দ্বিতীয় প্রজ্ঞাপনে সেই অভিযোগ অপ্রমাণিত বলা হয়েছে। আবার বিভাগীয় মামলার উল্লেখ থাকলেও সেখানে মামলার তারিখ নেই, যা স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী থাকা উচিত।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়ার মতে, কোনো সরকারি কর্মচারী সরাসরি প্রতিমন্ত্রীর কাছে এভাবে আবেদন করতে পারেন না। এটি সরকারি কর্মচারী আচরণবিধির পরিপন্থী। নিয়ম অনুযায়ী বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আপিলের সুযোগও থাকে না। তার মতে, মাত্র সাত কর্মদিবসে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হওয়া অস্বাভাবিক দ্রুত এবং এর কোনো নজির নেই।

এদিকে জানা গেছে, তবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আগেও বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ ছিল। তিনি বর্তমানে দুটি বড় প্রকল্পের পরিচালক, যার মধ্যে একটি প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার গ্রামীণ স্যানিটেশন প্রকল্প। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে এবং মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানেও অনেক ত্রুটির তথ্য পাওয়া গেছে। আইএমইডির প্রতিবেদনেও এসব প্রকল্পে দুর্নীতির বিষয় উঠে এসেছে।

পুনর্বহালের আগের দিন, ২১ এপ্রিল, তার প্রকল্পে অনিয়ম তদন্তের নির্দেশ দেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। তবে এর পরদিনই তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে পুনর্বহাল করা হয়, যা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনার পর জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে তবিবুর রহমানের পুনর্বহালকে কেন্দ্র করে মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা এই ঘটনাকে বিস্ময়কর বলে মন্তব্য করেছেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কেউ স্পষ্টভাবে কথা বলতে রাজি হননি। সচিব ও অভিযুক্ত কর্মকর্তার পক্ষ থেকেও বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

পুরো ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর এত কম সময়ে কীভাবে সেই অভিযোগ আবার অপ্রমাণিত হয়ে গেল, এবং পুরো প্রক্রিয়াটি আদৌ নিয়ম মেনে হয়েছে কি না।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ