রবিবার, এপ্রিল ২৬, ২০২৬

দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ, ৪৩ কোটি টাকার কাজ গেল নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হাতে

দরপত্রের শর্ত লঙ্ঘন করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাছে কোটি কোটি টাকার কাজ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)-এর বিরুদ্ধে। এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম। নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সড়কবাতির খুঁটি স্থাপন থেকে শুরু করে ওয়াকিটকি কেনা পর্যন্ত বিভিন্ন কাজে অনিয়মের মাধ্যমে ৪৩ কোটি টাকার বেশি কাজ নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে।

একটি বড় অভিযোগ এসেছে সড়কবাতির খুঁটি স্থাপনের দরপত্র নিয়ে। দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতার শর্ত ছিল। কিন্তু প্রোটোস্টার লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান অসম্পন্ন কাজের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে অংশ নেয়। দরপত্রে ‘সফলভাবে সম্পন্ন’ কাজের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি চলমান প্রকল্পের সনদ জমা দেয়।

এই অনিয়মের বিষয়টি সামনে এলে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী মূল্যায়নের নির্দেশ দেয়। কিন্তু সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে মূল্যায়ন কমিটি প্রতিষ্ঠানটিকে যোগ্য ঘোষণা করে। পরে ১৪ কোটি ২০ লাখ টাকার চুক্তি দেওয়া হয়।

একই ধরনের আরেকটি দরপত্রে প্রোটোস্টার লিমিটেড একাই অংশ নেয় এবং সেখানেও প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ না করলেও ২১ কোটি ১৯ লাখ টাকার কাজ পায়। দুইটি প্রকল্প মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩৫ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে।

এদিকে ওয়াকিটকি কেনায়ও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ডিএনসিসি ৩৮০টি ওয়াকিটকি প্রায় ৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকায় কিনেছে। যেখানে প্রতিটি সেটের দাম ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। অথচ একই ধরনের যন্ত্র বাংলাদেশ পুলিশ কয়েক বছর আগে কিনেছে মাত্র ৪৭ হাজার টাকায়।

বাজারমূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে দর নেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে কয়েকটির এই খাতে কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। একই সঙ্গে দরপত্রের ভাষা ও শর্ত প্রায় এক হওয়ায় যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। শেষ পর্যন্ত মেসার্স দ্য স্টেট আইটি লিমিটেডকে কাজ দেওয়া হয়, যদিও তারা নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করতে পারেনি।

আরেকটি প্রকল্পে দরপত্র জমা দেওয়ার ঠিক আগে হঠাৎ শর্ত পরিবর্তনের অভিযোগও রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক মানের শর্ত শিথিল করা হয় এবং নতুন কিছু শর্ত যুক্ত করা হয়, যা নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার জন্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

এই প্রকল্পে অংশ নেওয়া জেএপি ট্রেডিং সর্বনিম্ন দর দিয়ে কাজ পায়। কিন্তু তাদের প্রস্তাবে প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক বাজারে যেসব পণ্যের দাম ২০ হাজার টাকার মধ্যে, সেগুলোর জন্য প্রকল্পে প্রায় এক লাখ টাকা পর্যন্ত ধরা হয়েছে।

পরবর্তীতে বিপিপিএর নির্দেশে একটি দরপত্র বাতিল করা হলেও একই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার জন্য আবারও দরপত্র আহ্বানের সুপারিশ করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে সাইফুল ইসলাম বলেন, কোনো দরপত্রেই শর্ত লঙ্ঘন হয়নি এবং সব কিছু নিয়ম মেনেই করা হয়েছে। তবে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুরো ঘটনাটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি ক্রয়বিধি উপেক্ষা করে কীভাবে এত বড় অঙ্কের কাজ বারবার নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের হাতে গেল এবং এর পেছনে কারা জড়িত।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ