
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি ভবন নির্মাণকাজের টেন্ডারে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নানারকম অযৌক্তিক শর্ত জুড়ে দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. আলম হোসেনের বিরুদ্ধে। যবিপ্রবি বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আলম বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের দায়িত্ব পালন করেন। গত ১৪-১৫ বছরে তিনি ক্যাম্পাসের কোটি কোটি টাকার টেন্ডার সুকৌশলে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগার ঠিকাদারদের পাইয়ে দিয়েছিলেন। বর্তমান পরিবর্তিত সময়েও সেই আলমকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি এক্সিলেন্সি ভবন নির্মাণ প্রকল্পের পিডি করে সরকারের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখালেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যা নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্র ও শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্ষোভে ফুঁসছেন।
সূত্র বলছে, ক্যাম্পাসে এডিবি’র অর্থায়নে একটি ১০ তলা আইটি এক্সিলেন্সি ভবন নির্মাণে ২০১৬ সালে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। নানা জটিলতা কাটিয়ে ২০২৩ সালে এই প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় এডিবি। কিন্তু সময় স্বল্পতায় ওই বছর আর প্রকল্পের টেন্ডার আহ্বান করা সম্ভব হয়নি। পরের অর্থবছরে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আলমকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন ভিসি ড. আনোয়ার হোসেন।
এরই মধ্যে জুলাই বিপ্লব সংঘটিত হলে ভিসি আনোয়ার, আলমসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থি শিক্ষক-কর্মকর্তারা পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। পরে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল মজিদ যবিপ্রবি’র ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি যোগদানের পর পলাতক অনেকেই আর ক্যাম্পাসে ফিরে আসেননি। কিন্তু আলম দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থেকেও নতুন ভিসি যোগদানের পর স্বপদে বহাল হয়ে চাকরি করে যাচ্ছেন। আর এডিবি’র অর্থায়নে নির্মিতব্য ১৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ তলা আইটি এক্সিলেন্সি ভবনের টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করেন। তিনি সুকৌশলে এই ইজিপি টেন্ডার নোটিশে এমন কিছু শর্ত জুড়ে দেন যে, নতুন কোনো ঠিকাদার যেন টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে না পারে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের ২৮শে জানুয়ারি উক্ত প্রকল্প কাজের টেন্ডার নোটিশ একটি অখ্যাত দৈনিকের মাধ্যমে প্রকাশ করেন আলম। টেন্ডার নোটিশে শর্তারোপ করা হয় যে, বিগত ১০ বছরের মধ্যে যে সব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুরূপ ১০ তলা ভবন নির্মাণের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে কেবল তারাই অংশগ্রহণ করতে পারবেন। ফলে আওয়ামী ঘরনার ঠিকাদাররা ছাড়া কেউ এই টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে পারেনি।
সূত্র বলছে, এডিবি কাজের ক্ষেত্রে বিগত বছরগুলোতে এই ধরনের বড় বড় কাজের টেন্ডারে ৬০-৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্নকারী বা অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ঠিকাদারদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হতো। কিন্তু এবারই প্রথম ১০০ শতাংশ কাজের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে। এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি আলম ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে শর্তযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের সঙ্গে এক গোপন বৈঠকে মিলিত হয়ে উক্ত কাজ পাইয়ে দেয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন শীর্ষ ব্যক্তি অভিযোগ করেন- আলম তাদের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ এডভান্স হিসেবে দাবি করেন। ফলে নিষ্পত্তি না হওয়ায় তারা বৈঠক থেকে বেরিয়ে আসেন। পরবর্তীতে আরও দুটো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি বৈঠকে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে সূত্র নিশ্চিত করে। সূত্রটি জানায়, অর্থ লেনদেনের পরেই আলম প্রকাশিত ইজিপি টেন্ডারের শর্তাবলীতে ফের কিছু শর্তে পরিবর্তন করেন। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বেসরকারি কাজের অভিজ্ঞতার সনদ গ্রহণ করা হবে।
একইসঙ্গে পছন্দমাফিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগে পিডি’র সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এদিকে এর আগে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পিপিআরের শর্ত সংশোধনের জন্য চিঠি দিতে গেলেও পিডি মহোদয়ের দপ্তর তা গ্রহণ করেনি। কিন্তু ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে আওয়ামীপন্থি কতিপয় ঠিকাদারে সঙ্গে বৈঠকের পর পিপিআরে শর্তাবলীতে বেশ কয়েকটি ধারা উপ-ধারা সংশোধন করা হয়েছে।
সূত্র বলছে, এই ধরনের বড় বড় কাজের ক্ষেত্রে একবার ইজিপি টেন্ডার নোটিশ প্রকাশিত হলে সাধারণত: কোনো পরিবর্তন ঘটানো হয় না। কিন্তু এই ক্ষেত্রে কেবল মাত্র অর্থনৈতিক বেনিফিট এবং আওয়ামীপন্থি ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেয়ার লক্ষ্যেই বারবার পরিবর্তন হয়েছে। ফলে সাধারণ ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের দাবি টেন্ডারের কার্যক্রম স্থগিত করে বিষয়টি তদন্ত করে দোষী পিডিসহ অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
একইসঙ্গে দুর্নীতিবাজ পিডি আলমকে অব্যাহতি প্রদান করা হোক। তবে সব অভিযোগের বিষয়ে জানতে বারবার আলমের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তার মোবাইল ফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। মেসেজ দিলেও তিনি উত্তর দেননি।

