
এসিএম নিউজ, ঢাকা
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমানের স্ত্রী বীথি আদালতে দাঁড়িয়ে বললেন, গৃহকর্মী মোহনাকে নির্যাতন করা হয়েছে, তবে যেভাবে বলা হচ্ছে সেভাবে না। আমি মাঝে মাঝে চড় থাপ্পড় মেরেছি।’
আজ মঙ্গলবার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের প্রশ্নের উত্তরে বীথি এসব কথা বলেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রুবেল মিয়া গত ৮ ফেব্রুয়ারি ৪ জনকে ৭ দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। ওই আবেদনের ওপর শুনানির জন্য বিমানের এমডিসহ ৪ জনকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়।
শুনানির সময় মাথায় হেলমেট বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে চার আসামিকে আদালতের কাঠগড়ায় নেওয়া হয়। বিকাল সোয়া তিনটায় শুনানি শুরু হলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রুবেল মিয়া প্রথম বক্তব্য রাখেন। তিনি আদালতকে বলেন এই মামলাটি একটি চাঞ্চল্যকর ও স্পর্শকাতর মামলা। প্রতিনিয়ত শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতন করতেন ওই বাসার মালিকসহ অন্যরা। গরম খুন্তি দিয়ে গৃহকর্মীকে ছ্যাকা দেয়া হতো। সেই খুন্তি উদ্ধার করা প্রয়োজন। এতোটুকু শিশুকে কেন নির্যাতন করা হতো তার রহস্য উদঘাটনের জন্য প্রত্যেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
এরপর মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিয়োজিত আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার রিংকি সহ বেশ কয়েকজন আইনজীবী সুনামি করেন। শতাধিক আইনজীবী আসামিদের রিমান্ডে পাঠানোর পক্ষে সমর্থন জানান।
এক পর্যায়ে আদালত বিমানের সাবেক এমডি সাফিকুর রহমানের স্ত্রী বীথিকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন আপনারা শিশুটিকে নির্যাতন করতেন? বীথি প্রথমে বলেন, আমরা কোন নির্যাতন করিনি। শিশু মোহনার গায়ে আগে থেকেই নির্যাতনের চিহ্ন ছিল। অন্য এক বাসায় কাজ করার সময় তাকে ঝুলিয়ে পেটানো হতো বলে শিশুর বাবা যখন তাকে কাজে দেন তখন বলেছিলেন।
আদালত জানতে চান নির্যাতনের কয়টি চিহ্ন ছিল। বীথি বলেন, শিশুকে যখন আমার বাসায় নেওয়া হয় তখন তার গায়ে একটি চিহ্ন ছিল। আদালত আবারো বলেন, তার তো পা থেকে মাথা পর্যন্ত সব জায়গায় নির্যাতনের চিহ্ন। আগে কোনো বাসায় যদি নির্যাতন করা হতো তাহলে আপনি কেন তাকে বাসায় কাজে নিলেন? তখন বীথি জবাব দেন, যেভাবে টিভিতে বা ছবিতে দেখানো হয়েছে সেভাবে নির্যাতন করা হয়নি। আমি তাকে মাঝে মাঝে চড় থাপ্পড় মেরেছি। আদালত বলেন তার সারা শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন কেন? বীথি তখন নিশ্চুপ থাকেন।
আদালত বলেন, শিশু গৃহকর্মী মোহনাকে আপনি বাথরুমে থাকতে দিয়েছেন। সাফিকুরের স্ত্রী তখন কোন কথা না বলে নিশ্চুপ থাকেন।
আদালত তখন বিমানের সদ্য বিদায়ী এমডি সাফিকুর রহমানকে জিজ্ঞাসা করেন, নির্যাতনের বিষয়ে আপনি নিশ্চুপ ছিলেন কেন? আপনি একটি দায়িত্বশীল পদে কর্মরত ছিলেন। আপনার বাসায় কেন এমন ঘটনা হবে? সাফিকুর রহমান তখন বলেন, এভাবে নির্যাতন হয়নি আগের বাসা থেকে সে নির্যাতিত হয়ে এসেছিল তার চোখ মুখ ফোলা ছিল।
আদালত ওই বাসার আরেক গৃহকর্মী রূপালীকে প্রশ্ন করেন, আপনারা কেন মোহনাকে মারধর করেছেন? উত্তরে রূপালী বলেন, ‘ আমি ছুটা বুয়া। ওই বাসায় কে তাকে নির্যাতন করেছে আমি জানিনা।’
শুনানি শেষে আদালত সাফিকু রহমানকে ৫ দিন, তাঁর স্ত্রী বীথিকে ৭ দিন এবং তাদের বাসার অন্য গৃহকর্মী সুফিয়া বেগমকে ৬ দিন ও রুপালী খাতুনকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার নির্দেশ দেন। আদালত আদেশে বলেন আগামী ১০ কার্য দিবসের মধ্যে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করে আদালতে হাজির করতে হবে।
গৃহকর্মী মোহনার বাবা গোলাম মোস্তফা রিমান্ড শুনানির সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন,
১১ বছরের শিশু গৃহকর্মী মোহনার বাবা গোলাম মোস্তফা গত ১ ফেব্রুয়ারি উত্তরা পশ্চিম থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামালায় সাফিকুর রহমান এবং তার স্ত্রী বীথি, বাসার দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমকে আসামি করা হয়। মামলা দায়েরের পর গত ২ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে তিনটার দিকে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে আসামিদের গ্রেপ্তার করে উত্তরা পশ্চিম থানা–পুলিশ। পরে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে সাফিকুর, তাঁর স্ত্রী বীথিসহ চারজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।

