মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৮, ২০২৬

মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ: সেবায় চরম ভোগান্তি

মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতাল জেলার প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র হলেও নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে এটি এখন সাধারণ মানুষের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসা সেবার মান অত্যন্ত নিম্নমানের, চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি চলছে, আর রোগীরা ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা পাওয়ার জন্য সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে বিভিন্ন পদে নিয়োগে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, একটি প্রভাবশালী চক্র কয়েক কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে। বিশেষ করে ১২ জন নতুন নিয়োগপ্রাপ্তের মধ্যে সবাই সনাতন ধর্মাবলম্বী হওয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের দাবি, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করা হয়েছে এবং দুর্নীতির মাধ্যমে স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালটিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক না থাকায় প্রতিদিনই রোগীদের চিকিৎসা নিতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। হাসপাতালের ২৩৯টি পদের মধ্যে বর্তমানে ৪৯টি পদ শূন্য রয়েছে। বিশেষ করে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অভাবে বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসা কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে ওয়ার্ডের সাধারণ চিকিৎসা পর্যন্ত রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। রোগীদের অভিযোগ, অধিকাংশ চিকিৎসক সময়মতো হাসপাতালে উপস্থিত হন না। বরং তাদের অনেকে বেসরকারি চেম্বারে বেশি সময় দেন। ফলে সাধারণ রোগীরা সরকারি হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার পরিবর্তে বাধ্য হয়ে প্রাইভেট ক্লিনিক ও চেম্বারে যেতে বাধ্য হন।

হাসপাতালের বেশিরভাগ যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে আছে, ফলে সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে না। এক্স-রে, আলট্রাসোনোগ্রাম ও এমআরআই মেশিন দীর্ঘদিন ধরে বিকল। অনেক রোগী বাধ্য হয়ে বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনছেন, যা তাদের জন্য বাড়তি খরচের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, হাসপাতালের লিফট দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট হয়ে আছে। ফলে জরুরি রোগীদের সেবা দেওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে, বৃদ্ধ ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।

সরকারি হাসপাতালগুলোতে নামমাত্র মূল্যে টিকিট পাওয়া গেলেও মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে সেই ৫ টাকার টিকিট সংগ্রহ করাটাই যেন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিন সকাল থেকেই দীর্ঘ লাইন পড়ে টিকিট কাউন্টারে। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও টিকিট না পেয়ে ফিরে যান। এরপরও রোগীদের দুর্ভোগ শেষ হয় না। টিকিট পাওয়ার পর ডাক্তার দেখাতে আরও দীর্ঘ অপেক্ষার শিকার হতে হয়। চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে লম্বা লাইন পড়ে যায়, কিন্তু অধিকাংশ রোগী পর্যাপ্ত সময় পান না চিকিৎসকের কাছে। চিকিৎসকেরা স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত রোগী দেখে বিদায় করে দেন, ফলে সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় বা পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ থাকে না।

হাসপাতালের রোগীদের জন্য নির্ধারিত খাবারের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। অনেকে অভিযোগ করেছেন, খাবারে পর্যাপ্ত পুষ্টি থাকে না এবং খাবারের পরিমাণও কম দেওয়া হয়। কিছু রোগী দাবি করেছেন, অনেক সময় তাদের ঠিকমতো খাবারই দেওয়া হয় না, আর দেওয়া হলেও তা অনুপযুক্ত এবং অস্বাস্থ্যকর। এছাড়া, কিছু স্টাফ ও তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা হাসপাতালের খাবার বাইরে বিক্রি করে দেন। ফলে রোগীরা প্রয়োজনীয় খাবার না পেয়ে অনাহারে থাকেন বা বাইরের খাবার কিনতে বাধ্য হন, যা অনেকের জন্য ব্যয়বহুল এবং কষ্টসাধ্য।

হাসপাতালের আশপাশে বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালরা রোগীদের বোকা বানিয়ে বাইরে চিকিৎসা নিতে বাধ্য করছে। অনেকে চিকিৎসকদের কাছে না গিয়েই এসব দালালের মাধ্যমে ভুল চিকিৎসা নিয়ে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। এছাড়া, সরকারি ওষুধ রোগীদের বিনামূল্যে দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক ওষুধ পাওয়া যায় না। ওষুধ বিতরণে অনিয়ম এবং ওষুধ চুরির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে দরিদ্র রোগীদের বাধ্য হয়ে বাইরের ফার্মেসি থেকে চড়া দামে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।

মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সাধারণ জনগণের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত দ্রুত এই অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দিয়ে চিকিৎসা সেবা স্বাভাবিক করতে হবে। হাসপাতালের যন্ত্রপাতি মেরামত করে কার্যকর করতে হবে। দালালচক্র ও ওষুধ চুরির সিন্ডিকেট নির্মূল করতে হবে। রোগীদের খাবারের মান উন্নত করা ও সঠিক পরিমাণে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায়, হাসপাতালটি জনগণের উপকারের পরিবর্তে দুর্ভোগের কারণ হয়েই থাকবে।

@ajkerdarpon

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ