বৃহস্পতিবার, অক্টোবর 29, 2026

ডিএসসিসিতে কর্মকর্তাদের গাড়িতে সীমার দ্বিগুণ-তিন গুণ জ্বালানি, বাসা-অফিসে যাতায়াতে অ্যাম্বুলেন্সও

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) কর্মকর্তাদের গাড়িতে মাসে ৪০০ থেকে ৬০০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, অথচ সরকারি নির্দেশনায় প্রাধিকারপ্রাপ্ত গাড়ির জন্য মাসিক সীমা ২০০ লিটার এবং সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য সর্বোচ্চ ২৫০ লিটার। জ্বালানি বরাদ্দের কোনো নিজস্ব নীতিমালাও নেই করপোরেশনের। প্রথম আলোর বৃহস্পতিবারের (২৯ অক্টোবর) এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাড়তি বরাদ্দের তেল চালকদের একাংশ বিক্রি করে দেন এবং কোনো কোনো কর্মকর্তা তা জেনেও নীরব থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ দাপ্তরিক কাজের বাইরে নিজেদের ও পরিবারের প্রয়োজনে গাড়ি ব্যবহার করেন। রোগী পরিবহনের অ্যাম্বুলেন্সে কর্মকর্তাদের বাসা থেকে অফিসে যাতায়াতের তথ্যও পাওয়া গেছে।

বছরে প্রায় আড়াই কোটি টাকা বাড়তি খরচ

করপোরেশনের অন্তত ৭৬ জন কর্মকর্তা গাড়ি ব্যবহার করেন। প্রথম আলোর হিসাবে, বর্তমানে তাঁদের গাড়ির জ্বালানিতে বছরে খরচ হচ্ছে প্রায় ৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। প্রত্যেকের গাড়িতে মাসে ২৫০ লিটার বরাদ্দ ধরলে (প্রতি লিটার ১৪৫ টাকা) বছরে খরচ হতো ৩ কোটি ৩০ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দ সীমার মধ্যে রাখলে বছরে প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা সাশ্রয় সম্ভব।

নথিতে যা পাওয়া গেছে

  • ১১ কিলোমিটার যাতায়াতে ৬০০ লিটার: প্রশাসকের একান্ত সচিব মনোয়ার হোসেনের ধানমন্ডির বাসা থেকে নগর ভবনে যাওয়া-আসার দূরত্ব ১১ কিলোমিটার, কিন্তু তাঁর গাড়িতে মাসে ৬০০ লিটার জ্বালানি বরাদ্দ, যার খরচ প্রায় ৮১ হাজার টাকা। এতে দিনে ১০০–১২০ কিলোমিটার চলার কথা।
  • প্রধান নির্বাহীর দুই গাড়ি: প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খয়বর রহমানের জন্য বরাদ্দ দুটি গাড়িতে মাসে প্রায় ৯৩০ লিটার জ্বালানি দেওয়া হয়, যার মাসিক খরচ প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৫০ টাকা; বছরে শুধু জ্বালানিতে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। কয়েকজন চালক জানিয়েছেন, দ্বিতীয় গাড়িটিও তাঁর কাজে ব্যবহার হয়। প্রথম আলোর আগের এক অনুসন্ধানে তৎকালীন প্রধান নির্বাহীর একটি গাড়ি পরিবারের সদস্যদের ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল; তখন নিয়ন্ত্রণে কমিটি গঠনের কথা বলা হলেও দুই গাড়ির রীতি বহাল আছে।
  • অন্যান্য কর্মকর্তা: গত জুনের নথি অনুযায়ী প্রশাসকের সহকারী একান্ত সচিবের গাড়িতে ৬০০ লিটার অকটেন (৮৭ হাজার টাকা), প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তার গাড়িতে ৫১৯ লিটার ডিজেল, সচিবের পদের গাড়িতে ৪৮০ লিটার, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার গাড়িতে ৪৭৮ লিটার অকটেন দেওয়া হয়েছে। স্থপতি, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা, সিস্টেম অ্যানালিস্ট, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের গাড়িতেও ৩০০ থেকে ৪৬৫ লিটার পর্যন্ত বরাদ্দ রয়েছে।
  • অন্য দপ্তরের গাড়িতে করপোরেশনের তেল: ‘স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব কর্তৃক ব্যবহৃত’ একটি গাড়িতেও করপোরেশনের তহবিল থেকে মাসে ৬০০ লিটার অকটেন দেওয়া হয়েছে, যার খরচ ৮৭ হাজার টাকা।

বাসা-অফিসে অ্যাম্বুলেন্স

করপোরেশনের দুটি হাসপাতাল ও একটি মাতৃসদনের তিন কর্মকর্তা রোগী পরিবহনের অ্যাম্বুলেন্সে বাসা থেকে অফিসে যাতায়াত করেন বলে অভিযোগ, যদিও নথিতে ব্যবহারের উদ্দেশ্য দেখানো হয়েছে ‘দাপ্তরিক কাজ’। ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা মহানগর শিশু হাসপাতাল ও নাজিরাবাজার মাতৃসদনের এই তিন অ্যাম্বুলেন্সে এক মাসে মোট ১ হাজার ২৮ লিটার ডিজেল দেওয়া হয়েছে, খরচ ১ লাখ ১৮ হাজার ২২০ টাকা। একই হারে চললে বছরে খরচ প্রায় ১৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা।

নীতিমালা নেই, চলছে পুরোনো রীতিতে

সরকারি যানবাহনে জ্বালানির সাধারণ সীমা ২০১০ সালের ১৩ এপ্রিলের প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত; ২০২০ সালে সচিব পর্যায়ের জন্য পৃথক সীমা ঠিক করা হয়। ডিএসসিসি কোন নির্দেশনা মেনে বরাদ্দ দিচ্ছে, তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। পরিবহন বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অতীতেও এভাবে দেওয়া হয়েছে, এখনো হচ্ছে।” একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, কয়েকবার নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও এগোয়নি। চালকদের একাংশ বাড়তি তেল বিক্রিকে নিয়মিত আয়ের উৎস বানিয়ে ফেলায় তাঁরা বিক্ষুব্ধ হতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকেও অনিয়ম চলতে দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তাঁরা।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, সংস্থার নিজস্ব নীতিমালা না থাকলেও সরকারের নীতিমালা মানতেই হবে; তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ কারও নেই। তিনি বিষয়টি দ্রুত খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।

প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খয়বর রহমান বলেন, “দুটি গাড়ি থাকলেও চড়া হয় না। এটা তো কেবল দক্ষিণ সিটিতে না, উত্তর সিটিতেও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার জন্য দুটি গাড়ি বরাদ্দ আছে।”

একান্ত সচিব মনোয়ার হোসেনের ভাষ্য, সব কর্মকর্তার জন্যই দিনে ২০ লিটার করে বরাদ্দ আছে, কেউ কেউ ১৫ লিটারও পান; নিজের গাড়ির তেল তিনি ইস্যু করেন না, পরিবহন বিভাগ দেয়।

পরিবহন শাখার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সচিব মো. মশিউর রহমান খান জানান, বরাদ্দের ভিত্তি জানতে চাইলেও তাঁকে এখনো জানানো হয়নি; ফাইল দেখতে চাইলে অধীনস্থরা বলেছেন, আগের কোনো কর্মকর্তা ফাইল দেখতে চাননি। ইচ্ছেমতো জ্বালানি ব্যবহার হয়ে থাকলে তিনি খোঁজ নেবেন এবং অপচয় কমানোর বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জনগণের অর্থে চলা প্রতিষ্ঠানে এমন নিয়মবহির্ভূত সুবিধা নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। যাঁরা নিয়ম ভেঙে এ সুবিধা নিচ্ছেন, তাঁদের অবিলম্বে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং স্পষ্ট নীতিমালা করে তা মানতে বাধ্য করতে হবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ