
রাজধানীর অভিজাত গুলশান-নিকেতন এলাকায় ‘পাবলিক পার্ক’ নির্মাণের আড়ালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রায় ১৫০ কোটি টাকা মূল্যের সরকারি জমি একটি হাউজিং সোসাইটির নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। হাতিরঝিল ম্যানেজমেন্ট ভবনের পাশে প্রায় ২৭ কাঠার এই প্লটে ‘নিকেতন লেডিস পার্ক’ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে রাজউক। তবে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত পার্কটি নিকেতন হাউজিং সোসাইটির নিয়ন্ত্রণেই চলে যেতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, এ প্রকল্পে নীতিগত অনুমোদন আদায়ে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করেছেন সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। জানা গেছে, ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত রাজউকের এক জরুরি বোর্ড সভায় উপস্থিত হয়ে তিনি পার্ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত দ্রুত অনুমোদনের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। যদিও চূড়ান্ত রেজুলেশনে এখনো কয়েকজন সদস্য স্বাক্ষর করেননি।
অভিজাত এলাকায় কোটি টাকার প্লট
সরেজমিনে দেখা যায়, বীর উত্তম মীর শওকত সড়কের নিকেতন হাউজিং সোসাইটির ফটকের পাশেই অবস্থিত রাজউকের মালিকানাধীন এই বিশাল প্লট। জমিটির দক্ষিণ পাশে হাতিরঝিল প্রকল্প এবং উত্তর পাশে গুলশান-বনানী লেক অবস্থিত। কয়েক মিটার দূরেই রয়েছে শহীদ ডা. ফজলে রাব্বী পার্ক।
বর্তমানে প্লটটির সড়কসংলগ্ন অংশ টিনের উঁচু বেড়া দিয়ে ঘিরে রেখেছে রাজউক। সাধারণ মানুষের প্রবেশও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেখানে রাজউকের সাইনবোর্ড টাঙানো রয়েছে।
ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, হাতিরঝিল প্রকল্পের বিভিন্ন বর্জ্য সেখানে ফেলা হচ্ছে। স্থানীয় চা দোকানি ওহীদুল ইসলাম বলেন, “আগে এই জায়গা ওমর গণি চৌধুরী ওরফে লাল বাহিনীর দখলে ছিল। প্রায় দুই বছর আগে সরকারি লোকজন এসে জায়গাটি উদ্ধার করে। এখন শুনছি এখানে নিকেতনের জন্য পার্ক করা হবে।”
নিকেতন ফটকের পাশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করা নিলুফা বেগম বলেন, “এই জায়গা নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়েছে। নিকেতন সোসাইটির লোকজন বলে এটা তাদের, আবার রাজউকও দাবি করে তাদের।”
বোর্ড সভায় নীতিগত অনুমোদন
রাজউকের বোর্ড সভার নথি অনুযায়ী, গত ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম বোর্ড সভায় ‘রাজউক নিকেতন লেক ভিউ পার্ক’ নির্মাণের প্রশাসনিক নীতিগত অনুমোদনের প্রস্তাব তোলা হয়।
রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) শেখ মতিয়ার রহমান, সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ বশিরুল হক ভুঁইয়া, সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) এরাদুল হক, সদস্য (উন্নয়ন) মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামসহ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় উত্থাপিত প্রস্তাবে বলা হয়, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় জমিটি পুনরায় দখলের ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই সেখানে নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সবুজায়ন ও বিনোদন সুবিধাসহ একটি পাবলিক পার্ক নির্মাণ করা হবে।
তবে দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর দাবি, পার্ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় বোর্ড সভায় উপস্থিত থেকে সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান নীতিগত অনুমোদনের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে নিকেতন সোসাইটিকে সুবিধা দিতেই এ প্রভাব খাটানো হয়েছে।
‘লেডিস পার্ক’ ঘিরে বাড়ছে প্রশ্ন
রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, জমিটি অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধার করতে সংস্থাটিকে দীর্ঘ আইনি লড়াই ও প্রভাবশালীদের চাপ মোকাবিলা করতে হয়েছে। বহু মামলা-মোকদ্দমা এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে উদ্ধার করা প্রায় ১৫০ কোটি টাকার জমি এখন আবার অন্যের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তাদের ভাষ্য, ‘লেডিস পার্ক’ নির্মাণের আড়ালে কৌশলে জমিটি হাউজিং সোসাইটির নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ অভিযোগের পেছনে দুটি বিষয় বড় ভূমিকা রাখছে। প্রথমত, সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে জরুরি সভায় উপস্থিত থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ এবং দ্বিতীয়ত, প্লটটির কয়েক মিটারের মধ্যেই একটি পার্ক থাকা সত্ত্বেও নতুন করে আরেকটি পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ।
বক্তব্য এড়িয়ে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে হোয়াটসঅ্যাপে কল দিতে বলেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। অভিযোগের বিস্তারিত উল্লেখ করে বার্তা পাঠানো হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
নথিতে উপস্থিতি ও সিদ্ধান্তের তথ্য থাকার পরও এ বিষয়ে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন রাজউকের এস্টেট ও ভূমি শাখার সাবেক সদস্য শেখ মতিয়ার রহমান, যিনি বর্তমানে সদস্য (অর্থ ও প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পরে তিনি বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। আমি কোনো স্বাক্ষর করিনি।”
এদিকে রাজউকের উপপরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান (এস্টেট ও ভূমি-১) দাবি করেন, পার্কটির মালিকানা রাজউকের কাছেই থাকবে। তিনি বলেন, “নারীদের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।” তবে পরে তিনি স্বীকার করেন, পার্ক পরিচালনা সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। যদিও নারীদের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

