
হাসপাতালে চিকিৎসক রোগী দেখে প্রয়োজনে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেন। এসব পরীক্ষা করতে দরকার হয় বড় বড় মেশিন ও রাসায়নিক। একেক পরীক্ষার জন্য একেক রাসায়নিক লাগে। এগুলোকে বলা হয় রিএজেন্ট। মেশিন ও রিএজেন্ট—সবই বিদেশ থেকে আনতে হয়। উন্নত বিশ্বের নামি-দামি কোম্পানিগুলো স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে এসব রপ্তানি করে। কিন্তু মেশিনগুলো বেশ দামি হওয়ায় আমাদের মতো গরিব দেশের হাসপাতালগুলো সব কিনতে পারে না। তাই কোম্পানিগুলো একটা বুদ্ধি বের করেছে। সরকারি-বেসরকারি অনেক হাসপাতালে তারা এসব মেশিন অনুদান বা উপহার হিসেবে দেয়। কিন্তু যে কোম্পানির মেশিন, সেই কোম্পানিরই রিএজেন্ট লাগে, নইলে পরীক্ষা হবে না। তাই মেশিন ফ্রি দিয়ে বাধ্য করে রিএজেন্ট কিনতে। এভাবে তারা রিএজেন্টের ব্যবসাটা একচেটিয়া করে নেয়।
এ পর্যন্ত কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু সমস্যা পরে হলোই! অসাধু ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ক্যাডার, মধ্যস্বত্বভোগী আর হাসপাতালের স্বার্থান্বেষী লোকজন মিলে গড়ে তুলেছে দুর্নীতির এক বিশাল চক্র। অতি সঙ্গোপনে সূক্ষ্ম কারসাজির মাধ্যমে তারা লুটে চলেছে রাষ্ট্রের টাকা। দীর্ঘ অনুসন্ধানের মাধ্যমে জাগো নিউজ তুলে এনেছে এই দুর্নীতির সম্পূর্ণ এক অজানা গল্প। দুই পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব আজ—
সরকারি হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের মেশিন উপহার দিয়ে রিএজেন্ট সরবরাহের আড়ালে কোটি কোটি টাকা লুটে নেওয়া হচ্ছে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক এক টেন্ডার পদ্ধতির সুবাদে। এ পদ্ধতি বছরের পর বছর ধরে জিইয়ে রেখেছে হাসপাতালের ভেতরেরই দুষ্টচক্র। তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করেই এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে পেশিশক্তিনির্ভর রাজনৈতিক ক্যাডার, মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ীচক্র।
অনুসন্ধানে জাগো নিউজের কাছে আরও প্রকটভাবে যেটা ধরা পড়েছে, সেটা হলো- এত বড় দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে মূলত নীতিমালার অভাবে। বছরের পর বছর সরকারি হাসপাতালগুলোয় মূল্যবান যন্ত্র বিনামূল্যে উপহার হিসেবে লেনদেন চলছে, আর এর আড়ালে চলছে সরকারি তহবিল তছরুফের কারসাজি। এই গুরুতর দুর্নীতির বিষয়টি তদারককারী কর্তা ব্যক্তিদের খুব একটা জানা আছে বলে মনে হয়নি বা জানা থাকলেও খুব একটা গা করেন না। তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সব শুনে বিস্মিত হন। পাশাপাশি তারা এ ধরনের যন্ত্র উপহার দেওয়া-নেওয়ার বিষয়ে সরকারিভাবে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, রিএজেন্টের দাম নির্ধারণ, লিখিত চুক্তির মাধ্যমে সরাসরি কোম্পানি বা ডিলারদের কাছ থেকে রিএজেন্ট কেনার প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে তুলে ধরেন।
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য
দেশের হাসপাতালের ল্যাবগুলোতে মার্কিন বেকম্যান কুল্টার, জাপানের সিসম্যাক্স, জার্মানির সিমেন্স, চীনের মিনড্রে এবং স্পেনের স্পিনরিঅ্যাক্টসহ অনেকগুলো ব্র্যান্ডের মেশিন চলে। এদের দেশীয় ডিলার যথাক্রমে ওএমসি, বায়োটেক সার্ভিসেস, বায়োট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, এবিসি করপোরেশন এবং রজনীগন্ধা ইন্টারন্যাশনাল।
সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে রিএজেন্ট এনে হাসপাতালগুলোতে সাপ্লাই দেওয়ার কথা এই ডিলারদেরই। বেসরকারি হাসপাতালে তাই করা হয়। কিন্তু সরকারি হাসপাতালগুলোতে রাজনৈতিক ক্যাডারসহ বিভিন্ন পেশিশক্তির বাধার ফলে সরাসরি টেন্ডারে অংশ নিতে পারেন না ডিলাররা। বাধ্য হয়ে তখন প্রভাবশালীদের মধ্য থেকেই কাউকে এজেন্ট দিতে হয়। তারা একটি ট্রেড লাইসেন্স করে ওই নামে এজেন্ট হন এবং টেন্ডারে অংশ নিয়ে ইচ্ছামতো দাম হাঁকান।
যেমন- শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত অর্থবছরে ওএমসি, বায়োটেক, এবিসিসহ বেশিরভাগ ডিলারের উপহার দেওয়া মেশিনের রিএজেন্ট সরবরাহের কাজ করেছে সিএসবি এন্টারপ্রাইজ। এই সিএসবি কোনো বিদেশি কোম্পানির ডিলার নয়, তারা স্রেফ ট্রেড লাইসেন্সধারী একটি এজেন্সি (ভেন্ডর)। এটির স্বত্বাধিকারী যৌথভাবে আনোয়ার ও পিন্টু নামে দুজন ব্যক্তি। এর মধ্যে পিন্টু স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজলের ঘনিষ্ঠজন। আনোয়ার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে আনোয়ার সামনে থেকে কাজ করছেন।
দেশের প্রতিটি সেক্টরের মতো স্বাস্থ্য সেক্টরও আকুণ্ঠ দুর্নীতে নিমজ্জিত। ল্যাবের মেশিন গ্রহণ ও রিএজেন্ট ক্রয় প্রক্রিয়ায় যে দুর্নীতি আপনারা তুলে এনেছেন, সেটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে এই সেক্টরে। এখন প্রশ্ন তুললে অনেকে আপনাদেরই অপরাধী বানিয়ে ফেলতে চাইবে।- অধ্যাপক ডা. এ বি এম ইউনুস
হৃদরোগ হাসপাতালে বেকম্যান কুল্টার কোম্পানির ডিলার ওএমসি গত অর্থবছরও নিজেরা রিএজেন্ট সরবরাহ করতে পারেনি। তাদের প্রতিনিধি হয়ে কাজ বাগিয়েছিল রেডিক্স ট্রেড লিমিটেড। এটির স্বত্বাধিকারী বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশীর্বাদপুষ্ট সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বিপ্লব।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে বিপ্লব জাগো নিউজের কাছে দাবি করেন, ‘অন্য সবার মতোই কোম্পানির প্রতিনিধিত্ব নিয়ে উন্মুক্ত টেন্ডারের মাধ্যমে বৈধভাবে ব্যবসা করেছি।’
হৃদরোগ হাসপাতালে রিসটেক নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও রিএজেন্ট সাপ্লাই দেয়। ইলিয়াস নামে একজনের মালিকানায়। পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা শেখ সেলিমের ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত এই ইলিয়াস টাঙ্গাইলের নাগরপুরে আওয়ামী লীগের এমপি প্রার্থী ছিলেন।
জানতে চাইলে চীনের মিনড্রে কোম্পানির ডিলার এবিসি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার সৌরভ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সব জায়গায় আমাদের বাজারমূল্য একই, বরং সরকারি হাসপাতালে কিছুটা কম। তবে কিছু জায়গায় আমরা সরাসরি দিতে পারি না। তখনই তৃতীয় হাত হয়ে দাম বেড়ে যায়।’
‘তাই বলে চার-পাঁচ গুণ বেশি হবে দাম?’ প্রশ্ন করলে সৌরভ এমন দামকে ‘অস্বাভাবিক’ স্বীকার করে বলেন, ‘আসলে এটাতে আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আমরা ব্যবসা করি। চাইলে আমরা মূল্য দিয়ে দিই। তারা বেশি নিলে আমাদের কী করার থাকে? সরাসরি আমরা কোনো হাসপাতালে গেলেই বাধার সম্মুখীন হই। স্থানীয়দের পেশিশক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আমরা যেতে পারি না। অনেক বার এমন হয়েছে, সরাসরি সরবরাহ করতে গিয়েও পারিনি। যেমন কিশোরগঞ্জ ও মানিকগঞ্জে গিয়ে ফিরে এসেছি। কোনোভাবে মেশিন ইনস্টলই করতে পারিনি। এটা দীর্ঘ সময় ধরে হয়ে আসছে স্বাস্থ্যখাতে। খুব কঠিন পরিস্থিতি।’
এরা কারা- প্রশ্ন করলে শাহরিয়ার সৌরভ বলেন, ‘একেক জায়গায় একেকজন কাজ করে। এর মধ্যে স্থানীয় লোকজন বেশি। এক সময় এদের রাজনৈতিক শেল্টার ছিল। এখন তো পরিস্থিতি ভিন্ন। আমরা চিন্তা করছি নিজেরাই দেবো। দেখি কী হয়?’
একই কথা বলেন বায়োটেক সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রমজান আলী। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘যারা হাতবদল করে কাজ নেয়, তারা জানে না কিছু। বরং ঝামেলা বাড়ায়। আমরা অনেক চেষ্টা করেও নিজেরা সরাসরি দিতে পারিনি। তৃতীয়পক্ষকে প্রতিনিধি দিতে হয়েছে। তৃতীয়পক্ষ হলে দাম বাড়বে- এটা তো স্বাভাবিক বিষয়। আপনারা যদি রোগীদের জন্য ভালো চান, এই হাতবদল বন্ধ করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘যতই গ্যাঞ্জাম হয়, ততই খরচ বাড়ে। হাসপাতালের পরিচালকের হাতে এসবের নিয়ন্ত্রণ। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব।’
বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে জানলাম এখানে চুরি হয়। ধরলাম। সমাধান হিসেবে একটি চুক্তি করে নিলাম, যাতে হাসপাতালের স্বার্থ সুরক্ষা হয়, কোম্পানিও বাঁচে।- জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী
একটি সরকারি হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, কেন কীভাবে দাম বাড়ে, মন্ত্রী-সচিবসহ সবাই জানেন। বাজেট আনতে, বিল ছাড় করাতে পদে পদে টাকা দেওয়া লাগে। অনুদানের মেশিন গ্রহণের সময় হাসপাতাল প্রশাসন, চিকিৎসক, টেকনোলজিস্টসহ অনেককেই ঘুস দিয়ে ম্যানেজ করতে হয়। বিল তুলতে গিয়েও হিসাব ও স্টোর শাখায় ঘুস দেওয়া লাগে।
হৃদরোগ হাসপাতালে রিএজেন্ট সরবরাহকারীদের একজন এসব কথার সঙ্গে আরও যোগ করেন- হাসপাতাল প্রশাসন বা সরকারে যারা আছেন, তারা চাইলে এই অনিয়ম বন্ধ করতে পারেন। কিন্তু তারা চান না। কারণ এতে তো তারাও ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হন।
অযৌক্তিক টেন্ডার
উপহারের এসব মেশিন পরিচালনার জন্য প্রতিবছর ওপেন টেন্ডারের (উন্মুক্ত দরপত্রে) মাধ্যমে রিএজেন্ট কেনে সরকারি হাসপাতালগুলো। কিন্তু এসব মেশিনের রিএজেন্ট উন্মুক্ত বাজারে পাওয়া যায় না। যাদের মেশিন, তারাই শুধু রিএজেন্ট সরবরাহ করে। এ অবস্থায় উন্মুক্ত দরপত্রে লাভ কী বা আদৌ প্রয়োজন আছে কি না- প্রশ্ন করলে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঠিক বলেছেন। পণ্য যখন বাজারে উন্মুক্ত নয়, যারা মেশিন দিচ্ছে, তারাই রিএজেন্ট দেবে, এখানে উন্মুক্ত দরপত্রের প্রয়োজন নেই। বরং চুক্তি করে নিলেই হয়। কিন্তু আমাদের তো বিধিবদ্ধ নিয়মে চলতে হয়। উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া তো অডিটে মানবে না।’
এই পরিচালক আরও বলেন, ‘আপনি যেটা ধরেছেন, আমাদের অনেকে এটা বোঝেও না। এই কাজ তো চিকিৎসকদের না। প্রশাসনিক কাজ যারা করেন, তাদের অনেকে বোঝেন না।’
এই কথার প্রমাণ পাওয়া যায় খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (অর্থ) ডা. শেখ ইফতেখার রহমানের বক্তব্যে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটা তো ওপেন টেন্ডারে কেনা হয়। টেন্ডারে কোটেড প্রাইস থাকে, তার ভেতরে যিনি প্রতিযোগিতামূলক কম দাম দেন, তাকে চুজ করে কেনা হয়।’ অথচ অধিদপ্তরের এই পরিচালক জানেনই না যে এতে কোনো প্রতিযোগিতা হয় না, প্রতিযোগিতার সুযোগও নেই। কারণ যে কোম্পানি যন্ত্র তৈরি করে, তারাই আবার রিএজেন্ট সরবরাহ করবে, নইলে সেই পরীক্ষাই হবে না।
আমাদের সব কাজ প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। অসংগতি তো আছেই। তবে বিষয়টি যেহেতু আপনাদের কল্যাণে আমাদের নজরে এসেছে, আমরা এটি নিয়ে কাজ করবো।-স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ সচিব মো. সাইদুর রহমান
জানতে চাইলে মেশিন ও রিএজেন্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবিসি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার সৌরভ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সোহরওয়ার্দী ও কিডনি হাসপাতালসহ ওই এলাকার হাসপাতালগুলোতে একটা সিস্টেম করা হয়েছে। একজন পরিচালক আমাকে ডেকে বলেন, যারা টেন্ডারে অংশ নেয়, আপনারা তাদের কাউকে একটা প্রাইস দিয়েন না। আপনি দিলেন ১০০ টাকা, সে টেন্ডারে ১২০ টাকা দিলো। এটা না করে অথরাইজ করা তিনজনকে কাছাকাছি তিন রকম দর দেন। যেমন ১০০ টাকার পণ্য একজনকে ১২০ টাকায় দিলেন, একজনকে ১১০ টাকা, আরেকজনকে ১০৫ টাকায় দিলেন। আপনারই পণ্য, কিন্তু আমরা বাছাই করে কম দামে নিতে পারবো। এ কারণে আমরা সেই হাসপাতালে তিনজনকে অথরাইজেশন দিচ্ছি।’
হৃদরোগে সেদিনের নেপথ্যে
গতকাল ছাপা হওয়া প্রতিবেদনের প্রথম পর্বের শুরুতেই ৭ আগস্টের যে রহস্যময় ঘটনার কথা বলা হয়েছিল, পরদিন ৮ আগস্ট থেকেই সে ঘটনার ভেতর-বাইরে অনুসন্ধান শুরু করে জাগো নিউজ।
প্রথম পর্ব: হাসপাতাল যখন সরকারি-১/ফ্রি মেশিনে চুরির কারখানা
রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যাপক তৎপরতার ফলে সাড়া পড়ে যায় হাসপাতাল প্রশাসনে। ১২ আগস্ট সরিয়ে দেওয়া হয় প্যাথলজি বিভাগের তৎকালীন প্রধান (ভারপ্রাপ্ত) মেডিকেল অফিসার ডা. আব্দুল্লাহ আল মুয়ীদ খানকে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি করলেও কোনো রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। একই সঙ্গে ওইদিন আলো-আঁধারে হৃদরোগ হাসপাতালে ঢোকানো আটটি মেশিন রয়ে যায় বহাল তবিয়তে। সরাসরি গ্রহণ না করে আবার ফেরতও না দিয়ে মেশিনগুলো অদৃশ্য চাপে অফিসিয়ালি গ্রহণের চেষ্টা চলে।
অবৈধ পক্রিয়ায় নেওয়া মেশিনগুলো পড়ে আছে হৃদরোগ হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে। ছবি- জাগো নিউজ
এরই ধারাবাহিকতায় ১৭ সেপ্টেম্বর হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী চার বিভাগের প্রধানকে চিঠি দেন। তিনি লেখেন, ‘বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অনুদানের জন্য নিম্নোক্ত মেশিনসমূহের প্রস্তাবনা রয়েছে। আপনার বিভাগে উল্লেখিত মেশিনসমূহের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না? আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হলো।’
পরিচালকের এই চিঠির জবাবে চার বিভাগের প্রধানরা যথাসময়ে লিখিতভাবে জানান, ‘এসব মেশিন তাদের প্রয়োজন নেই’।
এরপর এসব জবাবসহ পুরো প্রক্রিয়াটি হাসপাতালের অনুদানের মেশিন গ্রহণ সংক্রান্ত কমিটিকে সিদ্ধান্ত নিতে বলেন পরিচালক। তারাও মেশিনগুলো নেওয়ার প্রয়োজন নেই মর্মে জানান।
সবশেষ গত ৭ নভেম্বর মেশিনগুলো নিয়ে যেতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে চিঠি দেন পরিচালক। অনুসন্ধানে ওই আটটি মেশিনের নাম-স্পেসিফিকেশন আসে জাগো নিউজের হাতে। এগুলোর মধ্যে ছয়টি উপহার হিসেবে পাঠায় এবিসি করপোরেশন, একটি বায়োটেক সার্ভিস ও একটি এসএস এন্টারপ্রাইজ।
কিন্তু পরিচালকের চিঠির পর এবিসি করপোরেশন গোঁ ধরে, তারা মেশিন নেবে না। বরং এবিসির বিপণন কর্মকর্তা আহসানুল রেজা প্যাথলজি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. দিলশাদ পারভীনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে অশোভন আচরণ করেন। ডা. দিলশাদ বিষয়টি পরিচালককে মৌখিকভাবে জানান।
আমাদের সীমাবদ্ধতা তো অনেক। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো- বাজেট স্বল্পতা, যার কারণে আমরা সব মেশিনারিজ কিনে দিতে পারি না। অনুদান বা উপহারের মেশিন নিতে হয়। এই সুযোগে একটা চক্র অনিয়ম বা দুর্নীতিতে জড়ায়। এগুলো বন্ধ করতে হলে পুরো সিস্টেমের খোলনলচে পাল্টে দিতে হবে।- স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম
অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে জানা যায়, এই এবিসি করপোরেশনের বিপণন কর্মকর্তা আহসানুল রেজা হৃদরোগ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসকের দায়িত্বে থাকা জুনিয়র কনসালট্যান্ট একরামুল রেজার আপন ভাই।
জানতে চাইলে ডা. একরামুল রেজা জাগো নিউজকে বলেন, ‘মেশিনগুলোর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবিসি করপোরেশনে আমার ভাই আহসানুল রেজা চাকরি করেন, এটা ঠিক। তারা আমার কাছে এসেছিল। আমি বলেছি সংশ্লিষ্ট বিভাগে যোগাযোগ করতে। আমি তাদের জন্য কোনো তদবির করিনি।’

