
গত বছরের ৫ আগস্টের পর সবচেয়ে লন্ডভন্ড অবস্থা হয়েছিল দেশের পুলিশ বাহিনীর। সারা দেশে থানা লুট, পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ এ বাহিনীকে বিপর্যস্ত এবং বিধ্বস্ত করেছিল। আওয়ামী লীগের পতনের পর বেশ কয়েক দিন দেশ ছিল পুলিশশূন্য। সশস্ত্র বাহিনী জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে নিয়োজিত ছিল।
এখনো স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারেনি পুলিশ বাহিনী। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীর মনোবল এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। কিন্তু মনোবলহারা পুলিশের কিছু সদস্য দুর্নীতিতে মনোযোগ হারায়নি। থানাগুলোতে এখনো দুর্নীতি চলছে।
তবে সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্তে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, নানা প্রতিশ্রুতি, উচ্চপর্যায়ের ঘোষণা এবং সীমিত সংস্কার প্রচেষ্টার পরও পুলিশের ভিতরের দুর্নীতির জাল ছিঁড়তে পারছে না সরকার। বরং এ দুর্নীতি আরও কাঠামোগত রূপ নিয়েছে, যা জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার আশাকে প্রতিনিয়ত বিপন্ন করে তুলছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা যায়, পুলিশ বিভাগের সেবা পেতে গিয়ে ঘুষ দিতে হয়েছে এমন ভুক্তভোগীর হার প্রায় ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ, পুলিশের সেবা এখনো সুলভ নয়, বরং তা একপ্রকার ‘মূল্য দিয়ে কেনা সুবিধা’ হয়ে উঠেছে। অপরদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের জরিপে বলা হয়েছে, পুলিশের সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির মুখোমুখি হয়েছেন এমন মানুষের হার ৭৪.৫ শতাংশ।
ঘুষ দিয়েছেন ৫৮ শতাংশ। এমন বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে।
পুলিশের অভ্যন্তরে ঘুষের যে রকম প্রকৃতি ও নকশা তৈরি হয়েছে, তা কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একপ্রকার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। নিয়োগ ও বদলিবাণিজ্য, মামলা ব্যবসা, অপরাধীদের সঙ্গে আঁতাত, রিমান্ডে নির্যাতনের মাধ্যমে অর্থ আদায়, রাস্তায় চাঁদাবাজি, এসব দুর্নীতির ধরন নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠেছে। পুলিশ সংস্কার কমিশন ইতোমধ্যে এসব দুর্নীতির অন্তত নয়টি ধরন চিহ্নিত করেছে, কিন্তু এখনো কার্যকর কোনো শাস্তির দৃষ্টান্ত জনগণ দেখতে পায়নি।
সড়ক-মহাসড়কে পুলিশের চাঁদাবাজি একটি দৃশ্যমান দুর্নীতি। পরিবহন খাতে এ চাঁদাবাজির টাকা ছাপানো সিøপ বা কাগজ দিয়ে তোলা হয়। ফুটপাত ব্যবসা বা ইনফরমাল সেক্টর পুলিশের দুর্নীতির অন্যতম একটি খাত। বিশেষত ঢাকা-চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় ফুটপাত দখল করে বসানো অবৈধ অস্থায়ী দোকানপাট থেকে পুলিশ দৈনিক দোকানপ্রতি ভাড়া আদায় করে। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের মতে, বছরে এই চাঁদার পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পুলিশের ঘুষ-দুর্নীতি সম্পর্কে বলেন, পুলিশের কোনো পরিবর্তনই হয়নি! আগে যে ব্যবসায়ীকে ১ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হতো, সে এখন বাধ্য হয়ে ৫ লাখ টাকা ঘুষ দিচ্ছে। এটাই সত্য, এটাই বাস্তবতা। পুলিশের কোনো পরিবর্তনই হয়নি বরং আরও হয়রানি করছে। একবার বলছে অমুকের কাছে যাও, একবার বলছে কোর্টে যাও, এভাবে তারা দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

