বৃহস্পতিবার, জুন ২৫, ২০২৬

বহিরাগত সিন্ডিকেটের কব্জায় নাটোর জজ কোর্ট: বিচারপ্রার্থীরা জিম্মি, নেপথ্যে জেলা জজ ও ‘মজিবর পরিবার’

বিশেষ প্রতিনিধি, নাটোর:নথি জালিয়াতি, ঘুষ বাণিজ্য আর স্বজনপ্রীতির চাদরে ঢাকা পড়েছে নাটোর জেলা জজ আদালত। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তান, আত্মীয়-স্বজন এবং একদল চিহ্নিত বহিরাগতদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে আদালতের অত্যন্ত গোপনীয় ও সংবেদনশীল নথিপত্র। ফলে ন্যায়বিচারের আশায় আসা সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত শিকার হচ্ছেন চরম হয়রানি ও প্রকাশ্য চাঁদাবাজির। ইতিপূর্বে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে প্রশাসন। এমনকি স্থানীয় আইনজীবী সমিতির (বার) শীর্ষ নেতাদের জানিয়েও কোনো প্রতিকার মেলেনি। সাধারণ মানুষের অভিযোগ— জেলা জজ এবং অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মাহমুদুল হাসান তাদের ওপর অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই সিন্ডিকেটকে দীর্ঘদিন ধরে লালন-পালন করছেন।
​রেকর্ড রুম ও এজলাসে বহিরাগত রাজত্ব: তথ্য ফাঁসের শঙ্কা
​আদালতের নিয়ম অনুযায়ী, নথিপত্র রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব কেবল বৈধ কর্মচারীদের। কিন্তু নাটোরে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। টাকার বিনিময়ে অবৈধ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এখানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে একদল বহিরাগত দালাল। ভুক্তভোগী বিচারপ্রার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
​”টাকা দিলে ফাইল নড়ে, না দিলে ফাইল গায়েব হয়ে যায়। আদালতের পিয়ন-সহকারীদের চেয়ে এই বহিরাগতদের পাওয়ার বেশি।”
গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র এভাবে অরক্ষিত ও অপেশাদারদের হাতে থাকায় বিচার ব্যবস্থার গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে।
​৩৪ জনের অবৈধ নিয়োগ ও ‘মজিবর সাম্রাজ্য’
​অনুসন্ধানে জানা যায়, এই বিচারালয়কে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করার পেছনে রয়েছে এক বিশাল আর্থিক লেনদেনের ইতিহাস। বর্তমান জজ ও অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মাহমুদুল হাসানের মেয়াদে প্রায় ৩৪ জন কর্মচারীকে সম্পূর্ণ অবৈধ পন্থায়, মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
​আর এই গোটা সিন্ডিকেটের মূল চালিকাশক্তি বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ হলেন সাবেক বেঞ্চ সহকারী মজিবর রহমান। আদালত পাড়ায় এটি এখন ওপেন সিক্রেট। মজিবর রহমান অবসরে গেলেও আদালতকে বানিয়ে গেছেন তার পারিবারিক আয়ের উৎস। বর্তমানে তার মেয়ে (বেঞ্চ সহকারী), মেয়ের জামাই বেঞ্চ সহকারী আলামিন এবং নিজের ছেলে বেঞ্চ সহকারী সোহাগ রহমান মিলে গড়ে তুলেছেন এক অজেয় ‘পারিবারিক সিন্ডিকেট’। এই চক্রটির ইশারা ছাড়া আদালতের একটি পাতাও নড়ে না।
​আইনজীবীদের কণ্ঠরোধ: বিচারিক প্রতিশোধের ভয়
​এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সাধারণ আইনজীবীদের ক্ষোভ আকাশচুম্বী হলেও তারা এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছেন। বারের সভাপতি ও সেক্রেটারির কাছে বারবার অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জানান,
​”আমরা যদি এই অনিয়মের প্রতিবাদ করি, তবে জেলা জজ ও তার সিন্ডিকেট আমাদের ওপর বিচারিক প্রতিশোধ নেয়। আমাদের মামলার মক্কেলদের জামিন দেওয়া হয় না, ইচ্ছে করে মামলার ক্ষতি করা হয় এবং শুনানির ডেট ফেলে রাখা হয়। মক্কেলের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে আমরা অনেক সময় মুখ বুজে এই অন্যায় সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছি।”
​প্রধান বিচারপতি ও আইনমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি
​আইন আদালতের এই প্রকাশ্য লুটপাট এবং বিচার ব্যবস্থার এমন অবক্ষয়ে নাটোরের সাধারণ জনগণের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির এই পাহাড় ধসিয়ে দিতে এবং নাটোর জেলা জজ আদালতের পবিত্রতা ফিরিয়ে আনতে ভুক্তভোগী জনগণ ও আইনজীবীরা অবিলম্বে মাননীয় প্রধান বিচারপতি এবং আইনমন্ত্রীর সরাসরি ও জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা অবিলম্বে বর্তমান জেলা জজের অপসারণ ও বদলিসহ এই পুরো দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ