
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে প্রভাব বিস্তার করা বিতর্কিত কর্মকর্তাদের অনেকেই এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এমনই একজন হিসেবে আলোচনায় এসেছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) ময়মনসিংহ সার্কেলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শওকত আলীর নাম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সওজে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন শওকত আলী। বিভিন্ন টেন্ডার, বদলি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তার প্রভাব ছিল ব্যাপক। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তিনি অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতেন। সরকার পরিবর্তনের পর নতুন রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির চেষ্টাও করছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
সম্পদের বিস্তার নিয়ে প্রশ্ন
জামালপুরের সরিষাবাড়ীর বাসিন্দা শওকত আলীর বিরুদ্ধে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, তার বড় ভাই যুবায়দুল ইসলামের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যবসা ও সম্পদ পরিচালনা করা হয়।
বরিশালে ‘পুরবী ট্রেডার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঠিকাদারি ও মিক্সার প্লান্ট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া রাজধানীর আফতাব নগরে একাধিক বহুতল ভবন ও দামী প্লট, আশিয়ান সিটিতে প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের জমি ও ছাত্রাবাস থাকার তথ্যও সামনে এসেছে।
নিজ এলাকা সরিষাবাড়ীতেও বিলাসবহুল বাড়ি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি চাকরির আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
টেন্ডার বাণিজ্য ও কমিশন সিন্ডিকেটের অভিযোগ
সওজের বিভিন্ন বড় প্রকল্প— বিশেষ করে রাস্তা, সেতু ও ফ্লাইওভার নির্মাণকাজে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে শওকত আলীর বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
টাঙ্গাইল-ভূয়াপুর-তারাকান্দি সড়কের ১৮০ কোটি টাকার প্রকল্পে তার পরিবারের অংশীদারিত্ব থাকার অভিযোগও উঠেছে। এছাড়া কয়েকজন প্রভাবশালী ঠিকাদারকে নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রভাব বলয়
অভিযোগ রয়েছে, শওকত আলীর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, অতিরিক্ত বিল উত্তোলন ও নিম্নমানের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গোয়েন্দা সংস্থার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলে অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন তিনি। এতে অনেকে ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না।
বক্তব্য মেলেনি
অভিযোগের বিষয়ে জানতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শওকত আলীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন দাবি করেছেন, তিনি নিজেকে সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন এবং সম্পদের বিষয়গুলো পারিবারিক ব্যবসার অংশ বলে উল্লেখ করেন।
সচেতন মহলের মতে, সরকারি দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা দুর্নীতির নেটওয়ার্ক ভাঙতে হলে এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। একইসঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

