
কুষ্টিয়ার মিরপুর ও দৌলতপুর সীমান্তঘেঁষা পদ্মার দুর্গম চরাঞ্চল বর্তমানে বিভিন্ন সশস্ত্র বাহিনী, মাদক কারবারি ও অস্ত্র ব্যবসায়ীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বহলবাড়ীয়া ইউনিয়নের ইউপি সদস্য উজ্জল হোসেনের প্রভাবকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যার কারণে সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর মিরপুর উপজেলার বহলবাড়ীয়া ইউনিয়নের নওদা খাদিমপুর গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গায়েন ও সর্দার বংশের দীর্ঘদিনের বিরোধ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। ওইদিন সকাল ৯টার দিকে সশস্ত্র হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় তৌহিদ সর্দার (৪২) নিহত হন। এ ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাঠে কাজ করতে যাওয়ার সময় সর্দার বংশের লোকজনের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। ঘটনার পর থেকেই পুরো চরাঞ্চলে উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিপক্ষ এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ায় ইউপি সদস্য উজ্জল হোসেনের প্রভাব আরও বেড়ে গেছে এবং তিনি প্রশাসনের তোয়াক্কা না করে এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মিরপুর ও দৌলতপুর সীমান্তবর্তী চরাঞ্চলে শুধু উজ্জল মেম্বার নয়, টুকু, সাইদ, লালচাঁদ, রাখি, কাইগি, রাজ্জাক ও বাহান্ন বাহিনীর মতো একাধিক সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব গ্রুপ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে জমি দখল, বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্র পাচার এবং মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।
স্থানীয়দের দাবি, পদ্মার জেগে ওঠা চর দখল করে জোরপূর্বক ফসল কেটে নেওয়া, ভারত সীমান্ত ব্যবহার করে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র আনা এবং সীমান্তপথে ফেনসিডিল ও ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক দেশে প্রবেশ করানো এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
একাধিক গোয়েন্দা সূত্রের তথ্যমতে, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সীমান্তবর্তী বহলবাড়ীয়া পয়েন্ট ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র দেশে প্রবেশ করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত তিনটি বড় চালানে প্রায় দুই হাজার আগ্নেয়াস্ত্র দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এর একটি বড় অংশ পদ্মার দুর্গম চরাঞ্চলের বিভিন্ন সশস্ত্র বাহিনীর হাতে রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভৌগোলিকভাবে দুর্গম হওয়ায় এবং রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা জেলার সীমান্তসংলগ্ন এলাকা হওয়ায় সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল সীমিত বলে জানা গেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অপরাধী চক্রগুলো নিজেদের শক্ত ঘাঁটি গড়ে তুলেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সম্প্রতি চরাঞ্চলে গোলাগুলিতে তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনার পর প্রশাসন কিছুটা সক্রিয় হলেও এখন পর্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার কিংবা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে দৃশ্যমান কোনো বড় অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি সদস্য উজ্জল হোসেন ফোনে বলেন, “আমি বর্তমানে চরে আছি, মহিষ চরাচ্ছি।” মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি জবাব না দিয়ে বলেন, “বর্ডার এলাকার মানুষ কমবেশি এসবের সঙ্গে জড়িত, প্রশাসনেরও তা জানা আছে।” পরে তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে বহলবাড়ীয়া ইউপি চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বলেন, “উজ্জল মেম্বারদের পরিবার প্রভাবশালী। তিনি সর্দার বংশের নেতৃত্ব দেন। সীমান্তবর্তী এসব এলাকায় এ ধরনের অপরাধ প্রায়ই ঘটে থাকে।”
অন্যদিকে, একজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগ নিয়ে বক্তব্য জানতে মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত আমান আজিজের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত যৌথ বাহিনীর অভিযান পরিচালনা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং তৌহিদ সর্দার হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

