
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) এর প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) কাজী হাসান বিন শামস-এর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে ।কাজী হাসান বিন শামস ১৯৯৮ সালের ১৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে যোগদান করেন। তার গ্ৰামের বাড়ী চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া অবস্থিত। ২০১৯ সালে তিনি প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সিডিএ সূত্রে জানা যায় আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ কালুরঘাট সড়ক প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ এর চার্জশিটভূক্ত আসামী কাজী হাসান বিন শামস বর্তমানে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) ও তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ১, তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা এখনো চলমান বলে জানা যায়, এবং তা সত্বেও তিনি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তা। অবাক কান্ড হলো চউকের তার বিরুদ্ধে বছরের পর বছর অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ও মামলা চলমান থাকার পরেও এখনো বহাল তবিয়তে আছেন।
দুর্নীতির অভিযোগ ও ক্ষমতার অপব্যবহার:
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)-এর প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কাজী হাসান বিন শামস। তবে তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, একাধিক পদে একক আধিপত্য বিস্তার এবং বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ‘সিটি আউটার রিং রোড’ প্রকল্প, যা ৩ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে, সেই প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগগুলো বিশেষভাবে গুরুতর।
এক ব্যক্তির হাতে একাধিক পদ:
বর্তমানে কাজী হাসান বিন শামস তার মূল পদ প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) থাকা সত্ত্বেও একাই ৪টি গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে রেখেছেন। এর মধ্যে তিনটি সরাসরি দায়িত্ব এবং একটি পদাধিকার বলে প্রাপ্ত। তার হাতে থাকা এই পদগুলো হলো
প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) ও ‘সিটি আউটার রিং রোড’ প্রকল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের প্রজেক্ট ডিরেক্টর (পিডি)। এ ছাড়া বর্তমানে আর পদাধিকার বলে নগর উন্নয়ন কমিটি সদস্য সচিবের দায়িত্ব ও তিনি পালন করে আসছেন।
এই পদগুলো সাংঘর্ষিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে এগুলো একাই সামাল দিয়েছেন। এর ফলে সেবাপ্রার্থীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
আউটার রিং রোড প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ:
নগরীর পতেঙ্গায় টানেলের প্রান্ত থেকে সাগরিকা পর্যন্ত সাগরতীর ধরে নির্মাণ করা হয় আউটার রিং রোড। ‘আউটার রিং রোড প্রকল্প’র মোট ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা, সেটিতে প্রায় ১৬০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, যা মোট ব্যয়ের ৬০%। প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে কাজী হাসান বিন শামস এই প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। ডিপিপি (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোফাইল) অনুযায়ী একজন পিডি-কে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও, তার একাধিক পদ থাকার কারণে এটি সম্ভব ছিল না। এ কারণে অনেক ব্যাঘাত ঘটেছে। এছাড়াও, তার বিরুদ্ধে ট্রুথ কমিশনে দুর্নীতির দায় স্বীকার করার এবং কালুরঘাট সড়ক প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের দায়ে চার্জশিটভুক্ত আসামি হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে কাজী হাসান বিন শামস বলেন’ এসব আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে, এখানকার কিছু কর্মকর্তা ও দালাল তাদের কিছু অনৈতিক প্রস্তাবে কাজ না করায় আমার পিছে লেগেছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ক্ষমতাচ্যুতি:
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর কাজী হাসান বিন শামসের ক্ষমতা কমে আসে। সিডিএ’র অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ও বঞ্চিত কর্মকর্তাদের ক্ষোভ প্রকাশ্যে আসে। এই চাপের মুখে তাকে পূর্বের ৮টি অতিরিক্ত দায়িত্ব ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয়। সিডিএ’র সচিব রবীন্দ্র চাকমা স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তার ছেড়ে দেওয়া পদগুলো তিনজন সিনিয়র প্রকৌশলীর মধ্যে বণ্টন করা হয়। এর মধ্যে নির্বাহী প্রকৌশলী এজিএম সেলিমকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ, মনজুর হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী-১ এবং আশরাফুল ইসলামকে আউটার রিং রোড প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে পদবঞ্চিত থাকা এই প্রকৌশলীরা বর্তমানে তাদের নতুন দায়িত্ব পেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
উল্লেখ্য প্রকল্পটি সিডিএর সাবেক চেয়ারম্যান ও নগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালামের আমলে নেওয়া। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত একদশক দায়িত্ব পালন করেছেন।
সচেতন মহল বলছে কাজী হাসান বিন শামস-এর একক আধিপত্যের ফলে সিডিএ’র স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, যা নাগরিক দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। আউটার রিং রোডসহ বিভিন্ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগগুলো গভীর তদন্তের দাবি রাখে। নতুন করে দায়িত্ব বন্টনের ফলে সিডিএ’র কাজে গতিশীলতা ফিরবে এবং নাগরিক সেবার মান উন্নত হবে বলে আশা করা যায়।
@pkagoj

