
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগপন্থি প্রভাবশালী ধনীদের ধন-সম্পদ নজরে আসে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। গত এক বছরে (২০২৫) ওইসব সম্পদশালীদের অর্থ-সম্পদের ভিত গুঁড়িয়ে দিয়েছে দুদক। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, এমপি, রাজনীতিক, আমলা, ব্যবসায়ীসহ অন্যান্য প্রভাবশালীদের অনেকে জেলে আছেন, অনেকে দেশ ছেড়েছেন। বিগত ১৬ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকা মোটা অংকের অর্থ-সম্পদের মালিক কেউই দুদকের জালের বাইরে নেই।
গত এক বছরে আওয়ামীপন্থি সম্পদশালীদের দেশে-বিদেশে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। দুদকের নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
গত এক বছরে দুদক ২ হাজার ২৯৭ জনের বিরুদ্ধে ৫৪১টি মামলা করেছে। এর মধ্যে আওয়ামীপন্থি প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে করা প্রায় ৩০০ মামলায় দেড় হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। একই সময়ে দুদক ১ হাজার ৬৩টি অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। এসব অভিযোগের বিপরীতে মামলা হয়েছে ৫৪১টি। তবে তা অনুসন্ধানের জন্য আমলে নেওয়া অভিযোগের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক মন্ত্রী, এমপি, আমলাসহ প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে দুদক। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা করা হয়। এরপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা, পরিবারের অন্যান্য সদস্য, সাবেক মন্ত্রী, এমপিসহ প্রভাবশালী সম্পদশালীদের বিরুদ্ধে অন্যদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করা হয়।
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার, প্রতারণা, জালিয়াতিসহ নানা অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে।
গত এক বছরে ১ হাজার ২০৩ জন আসামির বিরুদ্ধে আদালতে ৩৪৯টি মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামীপন্থি প্রভাবশালী সম্পদশালীদের বিরুদ্ধে প্রায় ১০০ মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়।
দুদকের একাধিক সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনামলে দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা অনিয়ম, দুর্নীতি, দখল, চাঁদাবাজি, ব্যাংকিং খাতের অর্থ লোপাট, উন্নয়ন কাজে সরকারি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎসহ নানা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তাদের দুর্নীতি সামনে আসায় আদালতের আদেশে দেশে-বিদেশে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। গত ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে দেশে-বিদেশে স্থাবর-অস্থাবর প্রায় ৪০০ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক, অবরুদ্ধ করা হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় খুবই কম।
শেখ হাসিনা ও তার পরিবার
চব্বিশের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণহত্যার দায়ে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর পাশাপাশি পিছিয়ে নেই দুর্নীতি ও অনিয়ম সংক্রান্ত মামলার তদন্তও।
সদ্য সমাপ্ত বছরে শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা, পরিবারের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধে ১৫টির বেশি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে প্লট জালিয়াতির অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে ৬টি মামলা করা হয়েছে। প্লট, ফ্ল্যাট জালিয়াতি, সূচনা ফাউন্ডেশন পরিচালনায় দুর্নীতিসহ অন্যান্য দুর্নীতির অভিযোগে শেখ হাসিনা ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হলেও এখন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা হয়নি।
মামলায় রায়ও হয়েছে
রাজধানীর নতুন আবাসিক প্রকল্প পূর্বাচলে ১০ কাঠা করে ৬০ কাঠার প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় শেখ হাসিনা, বোন শেখ রেহানা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোনের মেয়ে যুক্তরাজ্যের সাবেক মন্ত্রী (বর্তমানে এমপি) টিউলিপ সিদ্দিকসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
গত এক বছরে শেখ হাসিনা পরিবার ও তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ৬০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে, ঘুষ হিসেবে ঢাকার গুলশানে প্লট নেওয়ার অভিযোগে টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে, সূচনা ফাউন্ডেশনের নামে ৪৪৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ আত্মসাতের অভিযোগে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে, সিআরআইতে অনুদানের নামে ৪৩৯ কোটি টাকা লেনদেন ও আত্মসাতের অভিযোগে শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব, শেখ হাসিনা ঘনিষ্ঠ তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ অন্যদের বিরুদ্ধে, সেতু থেকে আদায় করা টোলের ৩০৯ কোটি টাকা আত্মসাৎসহ অন্যান্য অভিযোগে মামলা করা হয়।
শেখ হাসিনা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে ৩০০ মিলিয়ন ডলার পাচার, মেগা প্রকল্প থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে শেখ হাসিনা, বোন শেখ রেহানা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে। মুজিব জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ, ম্যুরাল ও ভাস্কর্য নির্মাণে ১০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।
গত বছরে দুদকের মামলাগুলোর মধ্যে বৃটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ অনুসন্ধান ও মামলার বিষয়টি বেশ আলেচিত ছিল। তার বিরুদ্ধে পূর্বাচল প্রকল্পে তার পরিবারের সদস্যদের নামে প্লট বরাদ্দে প্রভাব খাটানোর অভিযোগে মামলা করা হয়। প্রভাব খাটিয়ে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ফ্ল্যাট দখলের অভিযোগেও মামলা করা হয়।
আওয়ামী সংশ্লিষ্টতায় যারা ফেঁসে গেছেন
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে থাকা যারা ফেঁসে গেছেন তারা হলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা, শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, শেখ হাসিনার বোনের ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি, শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক, আজমিনা সিদ্দিক, সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, সাবেক মন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক, সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক নৌ মন্ত্রী শাহাজান খান, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক, সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী, সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, সাবেক ধর্মমন্ত্রী ফরিদুল হক, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, সাবেক প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমেদ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন, সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, সাবেক শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল, সাবেক প্রতিমন্ত্রী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলাম, সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুনশি, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক, সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, সাবেক ত্রাণ ও দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক নৌ-প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী।
এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি বাণিজ্য বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, এস আলম গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ সাইফুল আলম, সাবেক সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নাজমুল হাসান পাপন, গোলাম দস্তগীর গাজীসহ অন্যরা এ তালিকায় রয়েছেন।
ফেঁসে যাওয়া প্রভাবশালী এমপিরা
মোহাম্মদ হাবিব হাসান, বেনজির আহমেদ, এ কে এম সারোয়ার জাহান, শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ, শহিদুল ইসলাম বকুল, শেখ আফিল উদ্দিন, ছলিম উদ্দিন তরফদার, কাজী নাবিল আহমেদ, এনামুল হক, মামুনুর রশিদ কিরন, মহিবুর রহমান, মেহের আফরোজ চুমকি, কাজিম উদ্দিন, স্বপন ভট্টাচার্য, নূরে আলম চৌধুরী, আবু সাইদ আল মাহমুদ স্বপন, শেখ হেলাল উদ্দিন, জিয়াউল রহমান প্রমুখ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতায় ফেঁসে গেছেন।
@samakal

