
গত ১৭ ডিসেম্বর শিক্ষা বোর্ডের আপিল অ্যান্ড আর্বিটেশন বোর্ডের সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়। এ সিদ্ধান্তে অনেকটা হতবাক হয়েছেন বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী, স্থানীয় এলাকাবাসী ও পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, অভিযুক্ত শিক্ষক পুনরায় প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলে স্থানীয়রা তাকে মেনে নেবে না। এতে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম মো. আজিজুল হক। তিনি কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা হাজী মোহাম্মদ সাঁচি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাময়িক বরখাস্তকৃত প্রধান শিক্ষক।
সংশ্লিষ্ট নথি ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির আবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মালেক গত ১৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত আবেদন করেন। আবেদনে সাময়িক বরখাস্তকৃত প্রধান শিক্ষক আজিজুল হককে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করার দাবি জানানো হয়।
আবেদনে বলা হয়, আজিজুল হক ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ আগস্ট সাত দিনের চিকিৎসা ছুটি নিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। তবে নির্ধারিত সময় শেষে তিনি আর বিদ্যালয়ে যোগদান করেননি। অতিরিক্ত ২৫ দিনের ছুটির আবেদন করলেও দাখিল করা চিকিৎসা সনদে অসংগতি পাওয়া যায় এবং ওই ছুটি তৎকালীন সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনুমোদন দেননি। এরপর থেকে তিনি বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন।
পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে বিদ্যালয়ে যোগদানের জন্য তিন দফা নোটিশ দেওয়া হয়। এরপরও কোনো লিখিত জবাব না পাওয়ায় আইনি নোটিশ পাঠানো হয় এবং রামু থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের ৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত এডহক কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাময়িক বরখাস্ত থাকা সত্ত্বেও আজিজুল হক নিজেকে ‘বর্তমান প্রধান শিক্ষক’ পরিচয় দিয়ে শিক্ষা প্রশাসনের ইএমআইএস ব্যবস্থার পাসওয়ার্ড পাওয়ার জন্য আবেদন করেন, যা শৃঙ্খলাভঙ্গ ও বিধিবহির্ভূত।
পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি পেশাগত নিরিক্ষা ফার্মের মাধ্যমে ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদ্যালয়ের আয়–ব্যয়ের অডিট করানো হয়। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধান শিক্ষক আজিজুল হক বিভিন্ন খাতে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৭৯ হাজার ৯০২ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
এই প্রতিবেদন পরিচালনা কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় এবং অডিট আপত্তির বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষককে তিন দফা নোটিশ দেওয়া হয়। তবে নোটিশ গ্রহণ করলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
অডিট আপত্তির ব্যাখ্যা না দেওয়ায় পরিচালনা কমিটি তার বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি বাদী হয়ে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনে তদন্তাধীন রয়েছে।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলায় নিবন্ধনধারী হলেও সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) পদে সাজেদা বেগম নামের এক শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে মূল প্যাটার্নে নিয়োগ দেখিয়ে এমপিওভুক্তির চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) তদন্ত করে সাজেদা বেগমের শিক্ষক নিবন্ধন সনদ বাতিল করে এবং সনদ ব্যবহারকে ফৌজদারি অপরাধ ঘোষণা করে।
নথি অনুযায়ী, এই অনিয়মে সরকারের আনুমানিক ৩৫ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে।
এতসব অভিযোগ, অডিটে প্রমাণিত অর্থ আত্মসাৎ, দুদকের মামলা ও পরিচালনা কমিটির স্থায়ী বরখাস্তের আবেদনের পরও আপিল অ্যান্ড আর্বিটেশন বোর্ডের মাধ্যমে তাকে পুনরায় পদায়নের সিদ্ধান্ত দেওয়ায় স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, এলাকাবাসী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
@dainikshiksha

