মঙ্গলবার, জুন ৩০, ২০২৬

রাজউকে দুর্নীতির অভিযোগ—সংস্থাকে ‘টাকার খনি’ আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ জনমনে

কেউ উচ্চমান সহকারী, কেউ নিম্নমান সহকারী, কেউ বা বেঞ্চ সহকারী। তবে এক জায়গায় নিখুঁত মিল! সবাই কোটিপতি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) তৃতীয় কিংবা চতুর্থ শ্রেণির ২০-৩০ হাজার টাকা মাসিক বেতনের কর্মচারী হলেও অনেকের রাজধানীতে রয়েছে এক বা একাধিক বহুতল বাড়ি, আধুনিক গাড়ি। অনেকের আছে প্লট, ফ্ল্যাট, দোকানপাট।

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে রাজউকের কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা আছে। তবে তদন্তের গতি ধীর। অধিকাংশকে আইন স্পর্শ করছে না।
রাজউকের অফিস সহকারী বেলাল হোসেন চৌধুরী রিপনের অনিয়ম-দুর্নীতির মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক রতন কুমার দাস বলেন, ‘তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ নিয়ে কথা বললে নানা রকম চাপ আসে; তদন্তে বিঘ্ন ঘটে। তাই এ নিয়ে কথা বলা ঠিক হবে না।’

প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজউকের এই চিত্র সম্পর্কে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, ‘বিভিন্ন গবেষণায়ও রাজউকের অনিয়ম-দুর্নীতির নানা চিত্র উঠে আসে। এখানে চাকরি করে দুর্নীতির মাধ্যমে বাড়ি-গাড়ির মালিক হওয়াটা একেবারেই স্বাভাবিক। তবে কেউ এককভাবে দুর্নীতি করেন না। তাঁদের সহযোগিতা করেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অফিস সহকারীরা ওই সিন্ডিকেটের সামনের সারির লোক। পুরো সিন্ডিকেটই চিহ্নিত করতে হবে। তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে না পারলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। পেছনের সুরক্ষাকারীদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’

রাজউকের অফিস সহকারী জাফর সাদিককে রাজউক ভবন থেকে ধরে নিয়ে যায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। জিজ্ঞাসাবাদে জাফর সাদিক রাজধানীর আফতাবনগরের ডি ব্লকের ৫ নম্বর রোডে ২৯ নম্বর হোল্ডিংয়ে সাড়ে তিন কাঠা জমিতে ‘নূর আহমেদ ভিলা’ নামে আটতলা এবং ৩৩ শান্তিনগরে একটি ফ্ল্যাট থাকার কথা জানিয়েছেন। চাকরির পাশাপাশি রাজউকের প্লট বেচাকেনার মধ্যস্থতা, নকশা পাস করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পাওয়া ঘুষের টাকায় এসব সম্পদ গড়েছেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানান তিনি। পরে মূল অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় পরদিনই জাফর সাদিককে ছেড়ে দেয় পুলিশ।
অনুসন্ধানে জাফর সাদিকের মতো আরও ১৪ কর্মচারীর খোঁজ মিলেছে, যাঁদের বিত্তবৈভব কোনো অংশে কম নয়।

২. এম এ বায়েজিদ খান রাজউকের উত্তরা জোনের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে আছেন টানা ১১ বছর। উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৬ নম্বর সড়কের তিন কাঠার ৫ নম্বর প্লটটি তাঁর, সেখানে উঠেছে ছয়তলা বাড়ি। তৃতীয় তলায় পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি। বর্তমানে এটির বাজারমূল্য অন্তত ১০ কোটি টাকা। বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী ইসহাক মিয়া বলেন, ‘বছর দশেক হলো বাড়িটি স্যার বানিয়েছেন। তবে শুনেছি, জায়গাটি ছিল স্যারের শাশুড়ির।’
বায়েজিদ খান বাড়িতে আছেন কিনা জানতে চাইলে জানা যায়, নিজের গাড়িতে করে সকালেই অফিসে চলে গেছেন।

উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর রোডের ২০ ও ২২ নম্বর প্লট দুটিও বায়েজিদের। সেখানে দেখা যায়, পাশাপাশি দুটি প্লট এক করে ৯ তলা ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। নির্মাণকাজ তদারককারী বলেন, ‘প্রতি তলায় হবে চারটি ফ্ল্যাট। স্যার হজে যাওয়ার আগে পাঁচটা কলাম তৈরি হয়েছিল। এখন পুরোদমে চলছে কাজ।’ কোনো ফ্ল্যাট বিক্রি হবে কিনা জানতে চাইলে দারোয়ান বলেন, ‘বিক্রি হবে না, ভাড়া হবে।’

স্থানীয়রা জানান, ১২ নম্বর রোডের তিন কাঠা আয়তনের একেকটি প্লটের দাম অন্তত ছয় কোটি টাকা। ১২ কোটি টাকার দুটি প্লটে ৯ তলা ভবন তুলতে খরচ আনুমানিক আরও ১২ কোটি টাকা।

অঢেল সম্পত্তির ব্যাপারে বায়েজিদ খান বলেন, ‘যেটাতে থাকি, সেই প্লট শ্বশুরবাড়ি থেকে পেয়েছিলাম। আর আমি একটি প্লট রাজউক থেকে পেয়েছি। সেটাতে বাড়ি করার জন্য হাউস বিল্ডিং থেকে লোন নিয়েছি।’

৩. ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আবদুল মোমিনের মুগদায় রয়েছে প্রায় পাঁচ কাঠা জমির ওপর সাততলা বাড়ি। দক্ষিণ মান্ডার ৭১ নম্বর ওয়ার্ডের ৭ নম্বর বাড়িটির নাম ‘শান্তির নীড় সুলতানা মহল’। স্থানীয়রা জানান, এই বাড়ির বর্তমান দাম প্রায় ১০ কোটি টাকা। এ বাড়িতে একটি ছাড়া সব ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া। ভাড়া তোলেন মোমিনের ছোট ভাই সোহাগ। তিনি জানান, মতিঝিলের জসীম উদ্‌দীন রোডে তাঁর ভাইয়ের দুটি ফ্ল্যাট আছে। মোমিন সেখানে থাকেন। তবে ওই দুটি ফ্ল্যাটের হোল্ডিং নম্বর জানাতে অস্বীকৃতি জানান সোহাগ।

জসীম উদ্‌দীন রোডে স্থানীয় কয়েকজনের কাছে রাজউকের আবদুল মোমিনের বাড়ি কোথায়- জানতে চাইলে তাঁরা দেখিয়ে দেন। কয়েকজন জানান, মোমিন সাহেব অনেক ক্ষমতাশালী। বুকে সব সময় নৌকার ছবি লাগিয়ে চলাফেরা করেন। তাঁর ফ্ল্যাট নম্বর বি-৬, ১০ কবি জসীম উদ্‌দীন রোড, কমলাপুর, ঢাকা-১২১৭। ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ নামে ৯ তলা ভবনে এই ফ্ল্যাট ১ হাজার ৭২৫ বর্গফুটের, যার বাজারমূল্য ২ কোটি টাকার মতো।
ভবনের অন্য ফ্ল্যাটের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘মোমিন সাহেবের ফ্ল্যাটটি রাজকীয়ভাবে সাজানো। এখানে সাধারণ একটি ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া প্রায় ৫০ হাজার টাকা।’

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ