
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান ছিলেন ছুটিতে। এ সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউপি সদস্যকে হাত করে জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম করার অভিযোগ উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বুধল ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোহাম্মদ সুমন পারভেজের বিরুদ্ধে। মোটা টাকার বিনিময়ে কোনোপ্রকার বাছবিচার ছাড়াই একের পর এক জন্ম নিবন্ধন সনদ ইস্যু করেছেন পারভেজ। এমনকি রোহিঙ্গারাও টাকা দিয়ে তার কাছ থেকে জন্ম সনদ নিয়েছে।
সম্প্রতি বিষয়টি সবার সামনে এলে ওই এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এলাকার কেউ নিয়ম অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করলে মাসের পর মাস অতিবাহিত হলেও তা ইস্যু নিয়ে কোনো তাড়া দেখা যায় না। অথচ টাকা দিয়ে এখান থেকে অল্প সময়ের মধ্যেই জন্ম সনদ নিয়ে গেছে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আসা অসংখ্য মানুষ।
তাদের অভিযোগ, নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন জেলার বাসিন্দাদের স্ব স্ব ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জন্ম সনদ নেওয়ার কথা থাকলেও গোপালগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ফেনী, কুমিল্লা, ঢাকা, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, যশোর, রংপুর ও দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলার অধিবাসীরা বুধল ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জন্ম সনদ বানিয়েছেন। এসব সনদে তাদের ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ২ নম্বর বুধল ইউনিয়ন পরিষদ।
বিদেশ গমন, বিয়ে, নতুন ভোটার হালনাগাদ ও বয়স বাড়ানো-কমানোসহ নানা প্রয়োজনে টাকার বিনিময়ে নানা জায়গার মানুষ সুযোগের “সদ্ব্যবহার” করেছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
জন্ম নিবন্ধনের আবেদন ও সনদ ইস্যুর পর তা প্রিন্ট করতে হলে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও স্থানীয় ইউপি (ইউনিয়ন পরিষদ) চেয়ারম্যানের নির্দিষ্ট সার্ভার অ্যাকাউন্ট ও ওটিপির প্রয়োজন হয়। তাহলে চেয়ারম্যানের অগোচরে কীভাবে এমন ভয়াবহ দুর্নীতি ঘটল, তা জানতে চাইলে দুধল ইউপি চেয়ারম্যান আতিকুল রহমান (শফিক) বলেন, “২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত আমি ছুটিতে ছিলাম। এ সময় প্যানেল চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন ইউপি সদস্য (মেম্বার) মো. সাদেক মিয়া। আমার অনুপস্থিতিতে তার সঙ্গে আঁতাত করেই ইউপি সচিব পারভেজ এই জালিয়াতি শুরু করেন।”
জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করে ইউনিয়ন পরিষদের নারী উদ্যোক্তা ফারজানা আক্তারকে দিয়ে তারা সেগুলো প্রিন্ট করাতেন বলে জানান শফিক চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, “ছুটি থেকে ফিরে গত ২২ জানুয়ারি আমি অফিস শুরু করলে এক ব্যক্তি টেলিফোনে বিষয়টি আমাকে জানান। তারপর আমি খোঁজ নিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হই। পরে পারভেজকে এ বিষয়ে ধরলে চাপে পড়ে তিনি দায় স্বীকার করেন। এমনকি স্ট্যাম্পে লিখিতও দেন তিনি।”
ইউপি সংশ্লিষ্টরা জানান, এর আগে ২০২৩ সালেও সুমন পারভেজের বিরুদ্ধে একই ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ এনে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছিল। সে সময় আবেদন করা হলেও শুরুতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ওই ইউনিয়ন পরিষদেই কর্মরত ছিলেন তিনি। পরে অবশ্য বিষয়টি জানাজানি হলে সেখান থেকে তাকে কসবা উপজেলা খাড়েরা ইউনিয়ন পরিষদে বদলি করা হয়।
ইউনিয়ন পরিষদের নারী উদ্যোক্তা ফারজানা আক্তারের কাছে বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “আমাকে চাপ দিয়ে সুমন পারভেজ স্যার এসব কাজ করাতেন। ভয়ে আমি কাউকে কিছু বলতে পারি নাই। সব সময় তিনি আমাকে চাপের মধ্যে রাখতেন।”
নারী উদ্যোক্তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে কাজ হাসিলে সুমন পারভেজের বিরুদ্ধে এই অভিযোগে সমর্থন দেন শফিক চেয়ারম্যানও। বলেন, “তার (পারভেজ) বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।”

