বৃহস্পতিবার, জুলাই ৯, ২০২৬

পোস্টিং আছে, অফিস নেই; ১০ মাস ধরে বেতনহীন গণপূর্তের কর্মকর্তারা

গণপূর্ত অধিদপ্তরের নবসৃষ্ট পদে পদোন্নতি ও পদায়ন পাওয়া শতাধিক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে অফিস, বেতন-ভাতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর অভাবে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। অফিস কোড ও আইবাস কোড (iBAS) সৃজন না হওয়ায় তারা যেমন দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না, তেমনি টেন্ডারসহ উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে।

এমন পরিস্থিতির অন্যতম উদাহরণ ঢাকা ডিভিশন-২-এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সানাউল্লাহ। গত বছরের আগস্টে তাকে শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগ-৪-এ বদলি করা হলেও প্রায় ১০ মাস পরও তিনি কোনো অফিস কিংবা দায়িত্বাধীন এলাকা বুঝে পাননি। তার অধীনে নেই কোনো উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, স্টাফ অফিসার বা সহায়ক জনবল। অফিস কোড না থাকায় সংশ্লিষ্ট বিভাগের উন্নয়ন ও সংস্কার কাজও পরিচালিত হচ্ছে শেরেবাংলানগর-১ বিভাগ থেকে। একই সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতাও পাচ্ছেন না।

একই ধরনের পরিস্থিতিতে রয়েছেন জাতীয় সংসদ ভবনসহ শেরেবাংলানগর এলাকার সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন। গত মার্চে তাকে ইএম ডিভিশন-১২-এ বদলি করা হলেও এখন পর্যন্ত ওই বিভাগের কোনো অফিস বা দায়িত্বাধীন এলাকা নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে মাঝে মধ্যে পূর্ত ভবনের সংস্থাপন বিভাগে উপস্থিতি জানানো ছাড়া তার কোনো কাজ নেই। বেতন-ভাতা, স্টাফ কিংবা সরকারি গাড়ির সুবিধাও পাননি তিনি।

জানা গেছে, নবসৃষ্ট সার্কেল-৫-এর অধীনে মহাখালী গণপূর্ত বিভাগ, জরিপ বিভাগ এবং নতুন ঢাকা ডিভিশন-৫ অন্তর্ভুক্ত করা হলেও ঢাকা ডিভিশন-৫-এর বাস্তবিক কোনো অস্তিত্বই নেই। এমন পরিস্থিতি শুধু একটি বা দুটি বিভাগের নয়; গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক নবসৃষ্ট পদে কর্মকর্তাদের পোস্টিং দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট অফিস, প্রশাসনিক কাঠামো ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এখনো গড়ে ওঠেনি।

মূলত রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সরকারি স্থাপনা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০২৫ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নতুন সাংগঠনিক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে গত বছরের ৭ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মতিতে ৩১১টি নতুন পদ সৃজন করা হয়। এর মধ্যে বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের জন্য ১০৭টি পদ রয়েছে। তবে পদ অনুমোদনের পরও সংশ্লিষ্ট অফিস কোড ও আইবাস কোড সৃজন না হওয়ায় পুরো কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

অফিস কোড না থাকায় নতুন পদে কর্মরত কর্মকর্তারা বেতন-ভাতা তুলতে পারছেন না। একই সঙ্গে আইবাস কোড না থাকায় টেন্ডার আহ্বান, উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণসহ কোনো আর্থিক কার্যক্রমও পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, অফিস কোড ও আইবাস কোড সৃজনের বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হবে।

এদিকে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে নবসৃষ্ট ১৯টি অফিসের আইবাস কোড সৃজনের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠানো হলেও পাঁচ মাসের বেশি সময় পার হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, নবসৃষ্ট পদে দ্রুত পদোন্নতি ও পদায়ন দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট অফিসের আওতাধীন এলাকা নির্ধারণ, প্রশাসনিক কাঠামো গঠন, জনবল, লজিস্টিক সাপোর্ট ও অফিস পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। ফলে অনেক কর্মকর্তা এখনো জানেন না তাদের দায়িত্বাধীন এলাকা কোনগুলো।

এমন অবস্থার শিকার হয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চট্টগ্রাম) হিসেবে পদোন্নতি পাওয়া বিসিএস গণপূর্ত ক্যাডারের ১৫ ব্যাচের কর্মকর্তা মো. কায়কোবাদ। ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে তিনি বেতন-ভাতা ছাড়াই দায়িত্বে রয়েছেন। অবসরের মাত্র কয়েক মাস আগে এমন পরিস্থিতিতে তিনি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

একইভাবে ময়মনসিংহ থেকে নবসৃষ্ট সার্কেল-৫-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে বদলি হওয়া মোস্তফা কামাল এখনো নিজস্ব অফিস বা জনবল পাননি। বাধ্য হয়ে তিনি মহাখালী বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে বসছেন। তবে অফিস কোড না থাকায় কোনো প্রশাসনিক কাজই করতে পারছেন না। এতে একই কক্ষে কর্মরত নির্বাহী প্রকৌশলীও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। মোস্তফা কামালও প্রায় আট মাস ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, অস্তিত্বহীন অফিসে পোস্টিং, দায়িত্বহীন অবস্থান এবং দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় তারা মানসিক ও পারিবারিকভাবে চরম সংকটে পড়েছেন। তাদের ভাষায়, অফিস নেই, কাজ নেই, যানবাহন নেই, এমনকি জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় বেতনও নেই। তাদের প্রশ্ন, বাস্তবে তারা আদৌ চাকরিতে আছেন কি না—এর উত্তরও এখন তাদের কাছে নেই।

আরেক কর্মকর্তা বলেন, নতুন পদে পদায়নের আগে অফিস কোড, প্রশাসনিক কাঠামো, কর্মবণ্টন, জনবল, লজিস্টিক সাপোর্ট এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা উচিত ছিল। তা না করেই পদোন্নতি ও পোস্টিং দেওয়ার কারণেই আজ এই জটিল ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ