
বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন খাতের পরিচিত প্রতিষ্ঠান বাংলা টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ সামাদুল হককে ঘিরে কর ফাঁকি, শেয়ার হস্তান্তরে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান, মামলা এবং আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন নথি জব্দের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী গণমাধ্যম উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত সৈয়দ সামাদুল হক পরবর্তীতে বাংলাদেশে বাংলা টিভি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তবে টেলিভিশনটির মালিকানা কাঠামো ও শেয়ার বণ্টন নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর কাছে শেয়ার বিক্রির নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে শেয়ার হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার এবং হিসাব-নিকাশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল। কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে ব্যয় করা হলেও বাকি অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়েই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং দুদকের নজর পড়ে বলে জানা যায়।
প্রতিনিধি নিয়োগকে কেন্দ্র করেও বাংলা টিভির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় প্রতিনিধি নিয়োগের নামে অর্থ নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়োগপত্র, বেতন বা ভাতা প্রদান করা হয়নি। কিছু প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, প্রতিনিধিদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সব ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে অসন্তোষের খবর প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আর্থিক সংকটের কথা বলে মাসের পর মাস বেতন পরিশোধ না করলেও প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষের সম্পদ বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কর্মীদের একটি অংশ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এদিকে শেয়ার বিক্রি, বিজ্ঞাপন আয় এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য গোপন করে কর ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত আয় কম দেখিয়ে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে এবং কিছু অর্থ বিদেশে স্থানান্তরের চেষ্টাও করা হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই দুদক অনুসন্ধান শুরু করে।
২০২৩ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন বাংলা টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সামাদুল হকসহ প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন পরিচালক ও কর্মকর্তাকে তলব করে। দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, শেয়ার হস্তান্তর, অর্থ আত্মসাৎ এবং অর্থ পাচারের অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য গ্রহণের জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে শেয়ার কেলেঙ্কারির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা কিছু শেয়ার প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। এমনকি একই শেয়ার একাধিকবার বিক্রির চেষ্টার অভিযোগও উঠে আসে। এসব অভিযোগের পর তদন্ত কার্যক্রম আরও গুরুত্ব পায়।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সৈয়দ সামাদুল হকের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। সংস্থাটির দাবি, তার ঘোষিত আয় ও সম্পদের হিসাব পর্যালোচনায় বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কয়েক কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
একই মামলায় অভিযোগ করা হয়, বিপুল অঙ্কের অর্থের প্রকৃত উৎস গোপন করে তা বৈধ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে, যা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
মামলার ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার একটি আদালত সৈয়দ সামাদুল হকের আয়কর নথি জব্দের নির্দেশ দেন। আদালতে দুদকের আবেদনে বলা হয়, তার আয়, সম্পদ ও বিনিয়োগের প্রকৃত উৎস যাচাইয়ের জন্য পূর্ববর্তী করবর্ষগুলোর নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। আদালত সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলে সংরক্ষিত নথি জব্দের অনুমতি দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদের মামলায় আয়কর নথি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব নথির মাধ্যমে আয়, বিনিয়োগ, সম্পদ ক্রয় এবং আর্থিক লেনদেনের বৈধতা যাচাই করা সম্ভব হয়।
সৈয়দ সামাদুল হককে ঘিরে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোরই স্বাধীন যাচাই বা আদালত-স্বীকৃত প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, শেয়ার জটিলতা এবং কর্মচারীদের অসন্তোষের মতো অভিযোগ ওঠা শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, বরং সামগ্রিক গণমাধ্যম খাতের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বর্তমানে সৈয়দ সামাদুল হকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। দুদকের অনুসন্ধান, আদালতের নির্দেশনা এবং আর্থিক নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে। তবে আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগ আইনগতভাবে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে।

