
গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরকে কেন্দ্র করে আবারও উঠেছে দুর্নীতি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগ বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের গুরুতর অভিযোগ। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার আড়ালে একটি কথিত দালালচক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেওয়া এক অভিযোগপত্রে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান, নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব ও মো. মাসুদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে অধিদপ্তরে আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং অনুসন্ধানী সংবাদ ঠেকানোর কাজেও সক্রিয় ছিল এই চক্র।
সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগপত্রে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের বিপুল সম্পদের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়, রাজধানীতে তার একাধিক প্লট ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া গ্রামের বাড়িতে গড়ে তোলা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন বাংলো ও খামারবাড়ি। ব্যাংক হিসাবেও রয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরকারি চাকরির বেতনের সঙ্গে এসব সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই। একই সঙ্গে প্রকৃত সম্পদের তথ্য গোপন, আয়কর নথিতে অসত্য তথ্য প্রদান এবং পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ সরিয়ে রাখার অভিযোগও আনা হয়েছে।
টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টেন্ডার ও ক্রয় কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ভোলা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লাভিত্তিক কয়েকজন ঠিকাদারকে নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।
মিরপুর ডিভিশনের একটি বড় প্রকল্পে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া ভাষানটেক থানাসহ পুলিশের ১০৭টি থানা নির্মাণ প্রকল্পেও প্রভাব খাটানোর দাবি করা হয়েছে।
নিয়োগ বাণিজ্য নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরি দেওয়ার নামে জনপ্রতি ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে চাকরি নিশ্চিত না হওয়ায় টাকা ফেরত দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সাংবাদিকতার আড়ালে দালালচক্রের অভিযোগ
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো—গণপূর্তকে ঘিরে সাংবাদিক পরিচয়ে একটি কথিত দালালচক্রের সক্রিয়তা।
একাধিক সূত্রের দাবি, একজন ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়ে নিয়মিত গণপূর্ত অধিদপ্তরে অবস্থান করে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের হয়ে তদবির করতেন। অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্ত নিয়ে কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের প্রথমে হুমকি দেওয়া হতো, পরে অর্থের প্রস্তাব দিয়ে সংবাদ সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হতো।
সূত্র জানায়, ওই ব্যক্তি নিজেকে নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীবের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। অনলাইন নিউজ পোর্টাল থেকে প্রতিবেদন সরাতে চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
গণপূর্তের কয়েকজন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাংবাদিকতার আড়ালে দালালি এখন প্রতিষ্ঠানটির বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নারী সাংবাদিককে ঘিরে নতুন বিতর্ক
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, একটি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার নারী সাংবাদিকের সঙ্গে এক কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সাংবাদিককে ব্যবহার করে বিভিন্ন কর্মকর্তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টদের কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
ফেসবুক পোস্ট ঘিরে আলোচনা
গণপূর্ত অধিদপ্তরকে ঘিরে বিতর্ক নতুন মাত্রা পায় আখতারুজ্জামান খান রকি নামের এক ব্যক্তির ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টের পর।
ওই পোস্টে দাবি করা হয়, এক ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি কক্ষ ব্যবহার করে নিয়মিত অফিস করছেন এবং বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ না করতে তদবির ও চাপ প্রয়োগ করছেন।
পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
নির্বাচনের আগে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়। যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বক্তব্য মেলেনি অভিযুক্তদের
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান, নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব এবং মো. মাসুদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে এর আগে প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, “এসব অভিযোগ সঠিক নয়। আমাকে সবাই চেনে।”
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
প্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যদি এসব অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তা রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
তাদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে টেন্ডার সিন্ডিকেট, নিয়োগ বাণিজ্য, প্রভাব খাটানো এবং প্রশাসনিক অনিয়মের প্রকৃত চিত্র সামনে আনা জরুরি।

