বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেনের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মো. নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব খাটানো, রেলের জমি লিজ ও উচ্ছেদ কার্যক্রমে অনিয়ম এবং সম্পদ অর্জনসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্টরা।
মো. নাসির উদ্দিন টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার আউশনারা ইউনিয়নের হলুদিয়া কৈয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মৃত নবাব আলী ও ফাতেমা বেগম দম্পতির কনিষ্ঠ সন্তান। মধুপুর শহীদ স্মৃতি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে এইচএসসি পাস করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা নাসির উদ্দিন ছোটবেলা থেকেই মেধাবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। পরে ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০১৪ সালে তিনি বাংলাদেশ রেলওয়েতে যোগদান করেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, বাংলাদেশ রেলওয়ের ডিজির ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার আগে নাসির উদ্দিন সংশ্লিষ্ট ডিজিকে এসএমএসের মাধ্যমে নিজেকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। ওই এসএমএসের একটি কপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে তাঁর পিএস পদে নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া বিধি ও প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ ও প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে কর্মকর্তা (ডিটিএ) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে লেবার সর্দার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি খুলনার সিঙ্গিয়া স্টেশনের গুডস ইয়ার্ডে মোদাচ্ছের আলীকে অস্থায়ী লেবার সর্দার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য তিনি সিঙ্গিয়া স্টেশন মাস্টারকে নির্দেশ দেন। রেলওয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, এ ধরনের নিয়োগের এখতিয়ার সাধারণত সংশ্লিষ্ট স্টেশন মাস্টারের।
পরবর্তীতে ১৬ ফেব্রুয়ারি স্টেশন মাস্টার মো. শরীফুজ্জামান ওই নিয়োগ দেন বলে জানা যায়। তবে নিয়োগপত্রে দায়িত্বের মেয়াদ উল্লেখ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
রেলওয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ওই নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যশোর ও সিঙ্গিয়া স্টেশনেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল বলে জানা গেলেও এসব অভিযোগের চূড়ান্ত তদন্ত ফলাফল স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তবে অভিযোগগুলোর প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন এবং সংশ্লিষ্টদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
২০১৬ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ রেলওয়েতে সহকারী স্টেশন মাস্টার পদে ২৫৭ জনের নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
অভিযোগে বলা হয়, নিয়োগের ফল প্রকাশের আগে পরীক্ষার্থীদের নম্বরের টেবুলেশন শিট প্রস্তুত করা হয়নি এবং কোটা ব্যবস্থার অপব্যবহার করা হয়েছে।
এক চাকরিপ্রার্থীর অভিযোগ, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও চাহিদামতো ১০ লাখ টাকা দিতে না পারায় তাঁর নিয়োগ হয়নি।
তবে এসব অভিযোগে নাসির উদ্দিনের ব্যক্তিগত ভূমিকা বা দায় কতটুকু ছিল, তা সংশ্লিষ্ট তদন্ত নথি পর্যালোচনা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে গত বছরের ১ মে মন্ত্রী, পিএস কিংবা তাঁদের আত্মীয়স্বজনের রেফারেন্স ব্যবহার করে কাউকে অবৈধ সুবিধা না দেওয়ার নির্দেশনা জারি করা হয়।
এ প্রসঙ্গে রেলপথ মন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ আতিকুর জানান, তাঁর রেফারেন্স ব্যবহার করে এক বন্ধুর জন্য টিকিট সংগ্রহের একটি ঘটনা জানার পর তিনি সংশ্লিষ্ট স্টেশন মাস্টারকে ভবিষ্যতে এ ধরনের রেফারেন্স প্রত্যাখ্যানের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে যোগাযোগকারী নম্বরগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে পাঠিয়ে সংশ্লিষ্টদের পরিচয় শনাক্তের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলেও তিনি জানান।
অভিযোগকারীদের দাবি, নাসির উদ্দিনের গ্রামের বাড়িতে একটি ব্যয়বহুল ডুপ্লেক্স ভবন রয়েছে। এছাড়া ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে তাঁর নামে বা বেনামে জমি ও প্লট থাকার অভিযোগ রয়েছে।
তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে একটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এসব সম্পদের উৎস এবং তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা দুদকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
রেলওয়ের একজন কর্মচারী অতীতে এ বিষয়ে দুদকে অভিযোগ করেছিলেন বলেও দাবি রয়েছে। তবে ওই অভিযোগের বর্তমান অবস্থা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সাল থেকে নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সাইদা পারভীনের পরিচয় হয়। পরে ১৭ মে ২০২৩ সালে তাঁদের বিয়ে হয় এবং একই বছরের ১ জুন বিয়েটি রেজিস্ট্রি করা হয়।
সাইদা পারভীনের লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, বিয়ের আগে নাসির উদ্দিন তাঁর পূর্ববর্তী বৈবাহিক জীবনের তথ্য গোপন করেছিলেন। বিয়ের পর তিনি জানতে পারেন যে এটি নাসির উদ্দিনের তৃতীয় বিয়ে ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সাইদা পারভীনের আরও অভিযোগ, বিয়ের পর তাঁর কাছে ৩০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করা হয়। ওই অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে মানসিকভাবে নির্যাতন ও বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৩ সালের ২৫ মে থেকে মোবাইল ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারের মাধ্যমে তাঁকে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ, চরিত্রহনন এবং হুমকি দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া নাসির উদ্দিনের প্রথম স্ত্রী তানিয়ার সঙ্গে দাম্পত্য কলহ ও বিচ্ছেদকে কেন্দ্র করে মামলা হয়েছিল বলেও জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই বিষয়টি নিষ্পত্তিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়।
একাধিক বিয়ে এবং কয়েকজন নারীর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ থাকলেও প্রামাণ্য নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ছাড়া এসব বিষয়কে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, নাসির উদ্দিনের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করেই তিনি বিভিন্ন সময় সুবিধাজনক পদায়ন পেয়েছেন।
রেলওয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে একই জেলার বাসিন্দা হিসেবে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচয় এবং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান মহাপরিচালক আফজাল হোসেনের অবৈধ অর্থ সংগ্রহে ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করা এবং বড় বড় কাজ নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে পাইয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়মে নাসির উদ্দিন জড়িত।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রামাণ্য নথি ছাড়া চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
প্রতিবেদকের দাবি অনুযায়ী, ডিজি ও তাঁর পিএস—উভয়ের বিরুদ্ধে নারী সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগের তথ্য-প্রমাণ তাঁদের কাছে রয়েছে, যা যাচাই-বাছাই শেষে পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারী সাইদা পারভীনসহ সংশ্লিষ্টরা এসব অভিযোগের বিষয়ে কয়েকটি দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবিগুলো হলো—
বিশেষ করে লেবার সর্দার ও সহকারী স্টেশন মাস্টার নিয়োগ, রেলের জমি লিজ ও উচ্ছেদ কার্যক্রম, ডিজির পিএস পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া এবং সম্পদ অর্জনের বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com