জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এর কমিশনারের প্রটোকল অফিসার আয়রন চাকমাকে ঘিরে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, রপ্তানিকারকদের হয়রানি এবং অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন আকবর উল্ল্যাহ নামে এক ব্যক্তি।
৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে স্বাক্ষর করা ওই অভিযোগপত্র ৬ আগস্ট দুদকে জমা দেওয়া হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এতে আয়রন চাকমার চাকরিজীবন, বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্ব পালন এবং তার ও স্বজনদের সম্পদ বৃদ্ধিসহ একাধিক বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
অভিযোগকারীর দাবি, আয়রন চাকমার বাবা জ্যোতি প্রদীপ চাকমা এবং মা গীতা চাকমা একসময় আর্থিকভাবে অত্যন্ত অসচ্ছল ছিলেন। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বোয়ালখালী এলাকায় তাদের পারিবারিক ও আর্থিক অবস্থার সঙ্গে বর্তমানে আয়রন চাকমার জীবনযাপন ও সম্পদের তুলনা করলেই তার সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। চাকরিতে যোগদানের পর তার নিজের পাশাপাশি স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব এবং অন্যান্য সম্পদের পরিমাণ কীভাবে বেড়েছে, তা খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অভিযোগে আয়রন চাকমার চাকরিজীবনের একটি পর্যায়ের সঙ্গে তৎকালীন ঢাকা ভ্যাট পশ্চিম কমিশনার আবুল বাসার মোঃ শফিকুল হকের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য, ওই সময় আয়রন চাকমা তার প্রটোকল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, সে সময় কমিশনারের ঘুষের অর্থ সংগ্রহ এবং তা বিদেশে পাচারে সহায়তার সঙ্গে আয়রন চাকমার সম্পৃক্ততা ছিল। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে অভিযোগপত্রে নির্দিষ্ট কোনো নথি বা প্রমাণের বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি।
পরবর্তীতে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এ আয়রন চাকমার দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রেও আবুল বাসার মোঃ শফিকুল হকের ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে চট্টগ্রামের আইসিডিতে নেওয়ার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে তদবির করা হচ্ছিল বলেও অভিযোগকারীর দাবি।
এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আয়রন চাকমার পরবর্তী পদায়নও আলোচনায় এসেছে। এনবিআরের কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসন-৩ শাখা থেকে ১৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে আয়রন চাকমাকে কাস্টমস হাউস আইসিডি, চট্টগ্রামে বদলি/পদায়নের তথ্য প্রকাশ করা হয়। ফলে অভিযোগপত্রে আগে উত্থাপিত চট্টগ্রামের আইসিডিতে নেওয়ার চেষ্টার দাবি এবং পরবর্তী পদায়নের মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে অভিযোগকারী পক্ষ মনে করছে।
এনবিআরের প্রজ্ঞাপনে আয়রন চাকমার জন্মতারিখ ৭ মার্চ ১৯৮৮ উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এ কর্মরত এই কর্মকর্তাকে কাস্টমস হাউস আইসিডি, চট্টগ্রামে বদলি/পদায়ন করা হয়েছে। একই আদেশে ঢাকা (উত্তর)-এ কর্মরত আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকেও চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস আইসিডিতে পদায়ন করা হয়। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে জনস্বার্থে জারি করা আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করার কথা বলা হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ১৬ আগস্ট ২০২৬ নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
আয়রন চাকমার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এ কমিশনার মিয়া মোঃ আবু ওবায়দার প্রটোকল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন পর্যায় থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীর দাবি, এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত সহকারী কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার কিংবা উপকমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও তিনি তোয়াক্কা করতেন না।
লাইসেন্স শাখাকে ঘিরে অভিযোগের বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বিভিন্ন রপ্তানিকারক ও প্রতিষ্ঠান থেকে তার প্রত্যাশিত অর্থ না পেলে লাইসেন্স-সংক্রান্ত কার্যক্রম আটকে দেওয়া বা নাকচ করে দেওয়ার নানা ধরনের ভয় দেখানো হতো। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতো বলে অভিযোগকারীর দাবি।
অভিযোগপত্রে আয়রন চাকমার সম্পদের উৎস ও বৃদ্ধির বিষয়েও তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর তার নিজের, স্ত্রী এবং আত্মীয়স্বজনের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব সম্পদ তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে। তবে অভিযোগপত্রে সম্পদের নির্দিষ্ট মূল্য, ব্যাংক হিসাব নম্বর, সম্পত্তির দলিল বা নির্দিষ্ট আর্থিক লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
সব মিলিয়ে অভিযোগপত্রে আয়রন চাকমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতি, অর্থ আদায়, রপ্তানিকারকদের হয়রানি এবং সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগের পাশাপাশি তার পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষ করে অভিযোগ জমা দেওয়ার পরপরই চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস আইসিডিতে তার পদায়নের বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
দুদক চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া আবেদনে এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। অভিযোগপত্রের অনুলিপি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালকের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com