সরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত পাসপোর্টে নিজের পেশা ‘PRIVATE SERVICE’ উল্লেখ করেছেন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, গাজীপুরের সহকারী কমিশনার মো. আইয়ুব—এমন অভিযোগ উঠেছে। তাঁর নামে তিনটি পাসপোর্ট ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে। এসব পাসপোর্টের মাধ্যমে ২০১৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আট বছরে অন্তত ছয়টি দেশে ২৫ বার বিদেশ ভ্রমণের তথ্য উঠে এসেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল করা অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব বিদেশ সফরের আগে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় অনুমতি নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে তাঁর একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার, পেশাগত পরিচয় গোপন এবং ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণের সঙ্গে অর্থ পাচারের সম্ভাব্য যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগ দাখিলের কয়েক দিনের মধ্যেই গত ২৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ এক প্রজ্ঞাপনে মো. আইয়ুবকে গাজীপুরের কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়ে ‘বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ হিসেবে সংযুক্ত করেছে। তবে এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে দুদকে করা অভিযোগের সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, মো. আইয়ুবের নামে ব্যবহৃত পাসপোর্ট তিনটি হলো—BP03795**, A033271** এবং সর্বশেষ A091834**। এর মধ্যে সর্বশেষ পাসপোর্টটি ‘ORDINARY’ বা সাধারণ পাসপোর্ট হিসেবে ২০২৪ সালের ১৩ নভেম্বর ইস্যু করা হয় এবং এর মেয়াদ ২০৩৪ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত।
তবে পাসপোর্টের তথ্যের একটি বিষয় বিশেষভাবে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। পেশার ঘরে ‘PRIVATE SERVICE’ লেখা থাকলেও ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে বনানীর সরকারি কাস্টমস কোয়ার্টার। ফলে সরকারি চাকরিতে থাকা একজন কর্মকর্তার পাসপোর্টে বেসরকারি চাকরি হিসেবে পেশা উল্লেখ করার কারণ কী এবং সরকারি কোয়ার্টারের ঠিকানা কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এই অসামঞ্জস্যের বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ভ্রমণ-রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে মো. আইয়ুব সবচেয়ে বেশি ভারত সফর করেছেন। দেশটিতে তাঁর ভ্রমণের সংখ্যা ১২ বার। এ ছাড়া থাইল্যান্ডে ৭ বার, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২ বার, চীনে ২ বার এবং মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে একবার করে গেছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
তিন পাসপোর্টের ভ্রমণ-তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথম পাসপোর্ট BP03795** ব্যবহার করে ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত টানা সাতবার ভারত সফর করেছেন তিনি।
পরবর্তী পাসপোর্ট A033271** ব্যবহার করে ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারত, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ায় মোট ১০ বার ভ্রমণ করেন।
সর্বশেষ A091834** পাসপোর্ট ব্যবহার করে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত চীন, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে আটবার ভ্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে থাইল্যান্ডে তাঁর যাতায়াতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অন্তত পাঁচবার থাইল্যান্ড সফর করেছেন তিনি। অভিযোগকারী এসব সফরের সঙ্গে সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেনের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
| পাসপোর্ট নম্বর | ভ্রমণের তারিখ | ফ্লাইট নম্বর | সংশ্লিষ্ট দেশ |
|---|---|---|---|
| BP03795** | ০১ আগস্ট ২০১৮ | A1229 | ভারত |
| BP03795** | ০৮ নভেম্বর ২০১৮ | A1229 | ভারত |
| BP03795** | ১৫ মার্চ ২০১৯ | RX0971 | ভারত |
| BP03795** | ০১ মে ২০১৯ | RX0971 | ভারত |
| BP03795** | ২৮ জুন ২০১৯ | BS201 | ভারত |
| BP03795** | ১৫ নভেম্বর ২০১৯ | RX0971 | ভারত |
| BP03795** | ১৪ জানুয়ারি ২০২০ | BS201 | ভারত |
| A033271** | ২৯ এপ্রিল ২০২২ | EK583 | সংযুক্ত আরব আমিরাত |
| A033271** | ১৮ আগস্ট ২০২২ | BS201 | ভারত |
| A033271** | ০৬ অক্টোবর ২০২২ | BS203 | ভারত |
| A033271** | ১৭ মার্চ ২০২৩ | BS217 | থাইল্যান্ড |
| A033271** | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | EK587 | সংযুক্ত আরব আমিরাত |
| A033271** | ০২ নভেম্বর ২০২৩ | VQ721 | ভারত |
| A033271** | ০৫ জানুয়ারি ২০২৪ | VQ721 | ভারত |
| A033271** | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | BG388 | থাইল্যান্ড |
| A033271** | ১৩ জুন ২০২৪ | MH197 | মালয়েশিয়া |
| A033271** | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ | 6E1106 | ভারত |
| A091834** | ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ | BS325 | চীন |
| A091834** | ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ | BG388 | থাইল্যান্ড |
| A091834** | ০৩ জুলাই ২০২৫ | BG388 | থাইল্যান্ড |
| A091834** | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | MU2036 | চীন |
| A091834** | ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | BS217 | থাইল্যান্ড |
| A091834** | ১৭ মার্চ ২০২৬ | SQ447 | সিঙ্গাপুর |
| A091834** | ২১ মে ২০২৬ | BS217 | থাইল্যান্ড |
| A091834** | ১৮ জুন ২০২৬ | BS217 | থাইল্যান্ড |
সরকারি চাকরিতে থাকা কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রেও বিভাগীয় অনুমতি, ছুটি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি আদেশের বিষয় রয়েছে। তবে দুদকে দাখিল করা অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, মো. আইয়ুব তাঁর উল্লেখিত ২৫টি বিদেশ সফরের আগে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় অনুমতি নেননি।
এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তাঁর বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদনসংক্রান্ত নথি, ছুটির হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের রেকর্ড পরীক্ষা করার দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগে মো. আইয়ুবের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ অর্জন এবং এর একটি অংশ বিদেশে পাচারের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়।
অভিযোগকারী মনে করছেন, একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার, পাসপোর্টে সরকারি পরিচয়ের পরিবর্তে ‘PRIVATE SERVICE’ উল্লেখ এবং নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণের বিষয়গুলো একই সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ জন্য তাঁর ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন এবং বিদেশে কোনো বিনিয়োগ বা সম্পদ রয়েছে কি না—এসব তথ্য অনুসন্ধানের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অতীতে ওঠা সম্পদ ও পাসপোর্ট-সংক্রান্ত অভিযোগের প্রসঙ্গও টেনে আনা হয়েছে। অভিযোগকারীরা একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার, পেশাগত পরিচয় গোপন এবং ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণের বিষয়গুলোকে তদন্তের প্রয়োজনীয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গত ২৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে এনবিআরের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে মো. আইয়ুবকে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, গাজীপুর থেকে প্রত্যাহার করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়ে ‘বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ হিসেবে সংযুক্ত করা হয়।
প্রজ্ঞাপনের স্মারক নম্বর ০৮.০০.০০০০.০০০.০৩৮.২৭.০০০১.১৯.১৯৩। আদেশে বলা হয়েছে, ‘জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।’ রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনটি জারি করেন সিনিয়র সহকারী সচিব মিজানুর রহমত।
তবে প্রজ্ঞাপনে মো. আইয়ুবকে প্রত্যাহার বা সংযুক্ত করার নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। দুদকে অভিযোগ দাখিল এবং বদলির সময় কাছাকাছি হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হলেও, এই দুই ঘটনার মধ্যে সরাসরি কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক রয়েছে—এমন তথ্য এখনো নিশ্চিত নয়।
এখন মূল প্রশ্ন হলো—তাঁর বিদেশ ভ্রমণগুলো যথাযথ সরকারি অনুমোদন নিয়ে হয়েছিল কি না, পাসপোর্টে ‘PRIVATE SERVICE’ উল্লেখের কারণ কী, তিনটি পাসপোর্ট ব্যবহারের প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না এবং তাঁর সম্পদ ও বিদেশ ভ্রমণের ব্যয়ের সঙ্গে বৈধ আয়ের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না।
একই সঙ্গে এনবিআরের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট করা প্রয়োজন, ২৭ আগস্টের বদলি বা সংযুক্তির সিদ্ধান্তটি নিয়মিত প্রশাসনিক পদক্ষেপ, নাকি অন্য কোনো নির্দিষ্ট কারণে নেওয়া হয়েছে।
দুদক অভিযোগটি অনুসন্ধানে নিয়েছে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই হলে ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করলেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
নোট: দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিল করা অভিযোগ ও সরকারি নথির ভিত্তিতে এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন এবং প্রমাণিত নয়। অভিযুক্ত মো. আইয়ুবের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে সংযোজন করা হবে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com