বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) প্রকৌশল বিভাগে সরকারি অর্থের ব্যবহার, ঠিকাদারদের সঙ্গে লেনদেন এবং কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভিন্ন ভবন ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র সংস্কারের নামে দেখানো প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকার ব্যয়। এ ঘটনায় বিসিসির প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করেছেন এক সাংবাদিক।
অভিযোগকারীর দাবি, অ্যানেক্স ভবন, নগর ভবন, যান্ত্রিক ও পানি শাখা এবং কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংস্কারকাজের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয়ের হিসাব দেখানো হলেও বাস্তবে ওই পরিমাণ অর্থের কাজের দৃশ্যমান কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বিষয়টি যাচাই করতে এসব স্থাপনা সরেজমিনে পরিদর্শনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে অভিযোগে।
অভিযোগের আরেকটি দিক হলো, এই অর্থ কোন কোন কাজে এবং কোন খাতে ব্যয় করা হয়েছে, তা নিয়েও স্পষ্টতা নেই। বিসিসির হিসাব শাখার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকৌশল বিভাগ থেকে পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতেই ব্যয়ের হিসাব বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে প্রধান প্রকৌশলী নিজেই সংস্কারের জন্য বরাদ্দ অর্থ অন্য কোনো খাতেও ব্যয় হয়ে থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে অভিযোগকারী জানতে চেয়েছেন, সংস্কারের নামে দেখানো সাড়ে ৭ কোটি টাকার প্রকৃত ব্যবহার কোথায় হয়েছে এবং এর হিসাব কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি প্রকৌশল বিভাগের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে। দুদকে দেওয়া লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়, বিভিন্ন ফাইল অনুমোদন এবং বিল ছাড় করাতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হয়। এমনকি আগের সময়ের ১ থেকে ১ দশমিক ৫ কোটি টাকার বকেয়া বিল পরিশোধের ক্ষেত্রেও অর্থ দাবি করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ঠিকাদারদের পাওনা বিল সময়মতো ছাড় না দিয়ে কিংবা প্রয়োজনীয় ফাইল আটকে রেখে তাদের ওপর চাপ তৈরি করা হয়। পরে সেই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে প্রকৌশল বিভাগে একটি প্রভাবশালী কমিশনভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
প্রধান প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়েও অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বরিশালে তাঁর ছয়তলা ভবন, ঢাকায় একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সম্পদের সঙ্গে তাঁর বৈধ আয় ও আয়কর নথির সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিত না থাকার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, নিজের ব্যবসায়িক কাজে সময় দেওয়ার জন্য তিনি সপ্তাহে প্রায় দুই দিন ঢাকায় অবস্থান করেন। তাঁর হাজিরা ও মুভমেন্ট রেজিস্টার পরীক্ষা করলে এ বিষয়ে প্রকৃত তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে অভিযোগকারী উল্লেখ করেছেন।
হুমায়ুন কবিরের চাকরিজীবন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী। তথ্যমতে, ২০২০ সালে তাঁকে চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। পরে ২০২৪ সালে ওই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে তাঁকে পুনর্বহাল করা হয়। এরপর তিনি বিসিসির প্রধান প্রকৌশলীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসীন হন। এছাড়া ২০২৫ সালে বিসিসির যেসব বিভাগ দুদকের বিশেষ নজরদারি ও তথ্য তলবের আওতায় ছিল, প্রকৌশল বিভাগও তার মধ্যে ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত প্রধান প্রকৌশলী অতীতে অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার’ বলে দাবি করে আসছেন।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি বিষয়ে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাড়ে ৭ কোটি টাকার সংস্কারকাজের এমবি বুকস, কার্যাদেশ, টেন্ডারসংক্রান্ত নথি ও পেমেন্ট ভাউচার যাচাই; ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন দাবির অভিযোগের প্রমাণ অনুসন্ধান; এবং প্রধান প্রকৌশলীর আয়কর নথির সঙ্গে তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব মিলিয়ে দেখা।
এ ছাড়া সরকারি বিধি অনুযায়ী তাঁর পদায়ন, দায়িত্ব পালন ও কর্মস্থলে উপস্থিতির বিষয়টিও যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জনসমক্ষে জানানো উচিত। একই সঙ্গে বিসিসির সরকারি বরাদ্দ ও নগরবাসীর করের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com