পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাময়িক বরখাস্ত পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন ও তার স্ত্রী শাহান আরার নামে রাজধানী ঢাকাতেই অন্তত ১৪টি ফ্ল্যাটসহ প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এর বাইরে মামুনের নিজ জেলা টাঙ্গাইল এবং শ্বশুরবাড়ি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জেও বিপুল সম্পত্তি রয়েছে বলে জানা গেছে।
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে নিয়মবহির্ভূতভাবে পাসপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আব্দুল্লাহ আল মামুনকে সাময়িক বরখাস্ত করে। একই দিনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করে।
২০০৪ সালের মে মাসে সহকারী পরিচালক হিসেবে পাসপোর্ট অধিদপ্তরে যোগ দেন মামুন। কুমিল্লা ও নোয়াখালীতে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পুনরায় ক্ষমতায় এলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তার প্রভাব বাড়তে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৯ সালে পরিচালক পদে পদোন্নতি পেয়ে তিনি আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্ব নেন। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আস্থাভাজন হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওই পদে বহাল ছিলেন এবং এ সময়ে বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হন। গত ৫ আগস্টের পর তাকে সিলেটে বদলি করা হয়। পরে সেখান থেকেই তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
২০০৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে নিবন্ধিত দলিল বিশ্লেষণে আব্দুল্লাহ আল মামুন ও তার স্ত্রীর নামে ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অন্তত ১৪টি ফ্ল্যাট ও জমির তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। এসব সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
ধানমন্ডি ও এলিফ্যান্ট রোড এলাকায় মামুনের নামে ধানমন্ডির ১১/এ সড়কে ২ হাজার ২৫১ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, নর্থ রোডে ৯৮০ বর্গফুটের একটি এবং নিউ এলিফ্যান্ট রোডে ১ হাজার বর্গফুটের আরও একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। তিনটি সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১১ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
হাজারীবাগের সিকদার রিয়েল এস্টেটের ৭ নম্বর রোডে যৌথ মালিকানায় ১ হাজার ৪০০ বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এগুলোর আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা।
মোহাম্মদপুর ও কাটাসুর এলাকায় কাটাসুরের ‘হলি মদিনা’ ভবনে ১ হাজার ১০০ বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাট এবং চাঁদ হাউজিংয়ে ৭৬০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব সম্পত্তির মোট মূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা বলে সূত্রের দাবি।
এ ছাড়া বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ‘এফ’ ব্লকের ‘হলি অর্ণব’ ভবনে প্রায় ১ কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট এবং ইবরাহিমপুরে ২০ কাঠা জমির ওপর নির্মিত একটি বহুতল ভবনে যৌথ মালিকানার অংশীদারিত্ব রয়েছে বলে জানা গেছে।
আব্দুল্লাহ আল মামুনের পাশাপাশি তার স্ত্রী শাহান আরার নামেও একাধিক সম্পত্তির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ধানমন্ডির ৪ নম্বর সড়কে প্রায় ৫ কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট, কাটাসুরে আনুমানিক ২ কোটি ও দেড় কোটি টাকা মূল্যের দুটি ফ্ল্যাট এবং জোয়ার সাহারা এলাকায় প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
চারটি ব্যাংকে আব্দুল্লাহ আল মামুনের পাঁচটি ব্যাংক হিসাবের স্টেটমেন্ট পর্যালোচনা করে প্রায় ১৭ কোটি ৮৮ লাখ ৫৬ হাজার ৮৫৩ টাকা জমার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের দুটি হিসাবে যথাক্রমে ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৮৮ হাজার ৪৩৪ টাকা এবং ১ কোটি ৪৮ লাখ ৬১ হাজার ৮৬ টাকা জমার তথ্য রয়েছে।
এ ছাড়া ট্রাস্ট ব্যাংকের হিসাবে ২০ লাখ ৭০ হাজার টাকা, সোনালী ব্যাংকে ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা এবং জনতা ব্যাংকের হিসাবে ২ হাজার ৬৬৩ টাকা জমার তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনের নামে বিপুল অঙ্কের এফডিআর থাকারও ধারণা করা হচ্ছে।
সরকারি বেতনের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বলে অভিযোগ করা এসব সম্পদের বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সূত্রের দাবি, আব্দুল্লাহ আল মামুন তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে চাকরিতে পুনর্বহালের জন্য তদবির চালাচ্ছেন। তবে তার সম্পদ অর্জনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। একই সঙ্গে অনুসন্ধানে উঠে আসা সম্পত্তিগুলোর অস্তিত্বও তিনি অস্বীকার করেননি।
তবে এসব সম্পদ অবৈধভাবে অর্জিত কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com