বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, অবৈধ দখল ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে ‘এস এ কর্পোরেশন’-এর স্বত্বাধিকারী মো. শাহ আলমের বিরুদ্ধে। চট্টগ্রাম নতুন স্টেশন এলাকার দুটি পার্কিং ইজারা, রেলের বিভিন্ন বিভাগের টেন্ডার এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ আদায়কে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শাহ আলম রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে রেলওয়ের ঠিকাদারি কার্যক্রমে নিজের প্রভাব আরও বিস্তৃত করেছেন। তার নিয়ন্ত্রণে থাকা কথিত একটি ঠিকাদার সংগঠনের মাধ্যমে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন বিভাগের টেন্ডার থেকে নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম নতুন স্টেশন এলাকায় রেলওয়ের প্রায় ৭০ হাজার ও ৪০ হাজার বর্গফুট আয়তনের দুটি পার্কিং স্পেস রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শাহ আলম ও তার সহযোগী হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে পার্কিং দুটি ইজারা নেন। তবে ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও আদালতে মামলা করে জায়গা দুটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মামলা চলমান থাকা অবস্থায় রেলওয়ের নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা না নিয়ে শাহ আলমের প্রতিষ্ঠান ‘এস এ কর্পোরেশন’ থেকে খাজনা বাবদ অর্থ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রেলওয়ের সাবেক পাহাড়তলী বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা দীপঙ্কর তঞ্চঙ্গ্যা ও সাবেক আমীন আব্দুস সালামের ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা (সিইও), পাহাড়তলী বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা এবং আইন কর্মকর্তা মাহমুদের সহযোগিতায় সরকারি রাজস্বের পরিবর্তে ওই অর্থ ব্যক্তিগতভাবে সুবিধাভোগীদের কাছে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে রেলের রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে ‘মেসার্স রাব্বি ইঞ্জিনিয়ারিং’সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পার্কিং দুটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে বরাদ্দের জন্য আবেদন করলেও তা কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। রাব্বি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আলী বাদল দাবি করেন, বৈধভাবে পার্কিং বরাদ্দ দেওয়া হলে রেলের রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারত।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শাহ আলমের দীর্ঘদিনের সহযোগী হিসেবে পরিচিত যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর আত্মগোপনে চলে যান। এরপর শাহ আলম নিজের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত হতে শুরু করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সাবেক রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের সঙ্গে আত্মীয়তার পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করতেন শাহ আলম। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে ‘খাঁটি বিএনপি’ হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এর পাশাপাশি আইনগত নিবন্ধন বা অনুমোদন ছাড়াই ‘রেলওয়ে ঠিকাদার অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটি সংগঠন গঠন করে সেটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে শাহ আলমের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি নেতা শফিকুর রহমান স্বপনকে আহ্বায়ক এবং শাহ আলমকে সদস্য সচিব করে সংগঠনটি পরিচালনা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম ও ঢাকায় নিবন্ধিত প্রায় ১ হাজার ২০০ ঠিকাদারকে এই সংগঠনের মাধ্যমে প্রভাবিত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রকৌশল, বাণিজ্যিক, সরঞ্জাম ক্রয়, ভূ-সম্পত্তি ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিভাগের টেন্ডার থেকে ২ থেকে ৩ শতাংশ হারে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, শুধু প্রকৌশল বিভাগেই প্রতি অর্থবছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার উন্নয়নকাজ হয়। সেখান থেকে সংগঠনের নামে বছরে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কার্যাদেশ আটকে দেওয়া এবং রেল কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে রেলওয়ের উন্নয়নকাজের একটি অংশ কাঙ্ক্ষিতভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
শাহ আলমের প্রতিষ্ঠান ‘এস এ কর্পোরেশন’কে ঘিরেও বড় অঙ্কের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ও কথিত ঠিকাদার সংগঠনের প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার কাজ এককভাবে পাওয়ার চেষ্টা করছে।
এদিকে, গত ৪ আগস্ট ঢাকাগামী ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ট্রেন থেকে ৪ হাজার ৮৫০ পিস ইয়াবাসহ এস এ কর্পোরেশনের কর্মী স্টুয়ার্ড মাহবুবুর রহমানকে (২০) গ্রেপ্তারের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। বর্তমানে ওই কর্মী কারাগারে থাকলেও তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের মালিক শাহ আলমের কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা তদন্তের বিষয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। শুধু একজন কর্মীর গ্রেপ্তারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে অপরাধের দায় নিশ্চিত করা যায় না।
চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে শাহ আলম বলেন, টেন্ডার থেকে কোনো চাঁদা নেওয়া হয় না। তবে বার্ষিক পিকনিক ও ঠিকাদারদের সহযোগিতার জন্য ১ শতাংশ অর্থ নেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন। তার অভিযোগ, আগে হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ৫ শতাংশ করে নিলেও কেউ ভয়ে কথা বলতেন না।
ঠিকাদার সমিতির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি নেতা শফিকুর রহমান স্বপন বলেন, জোর করে টাকা নেওয়া হয় না; ঠিকাদারদের সহযোগিতার জন্য কিছু অর্থ সংগ্রহ করা হয়। তবে শাহ আলম কোনো অনিয়ম করলে তার দায় তিনি নেবেন না বলেও জানান।
অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা নির্ধারণে পার্কিং ইজারার নথি, আদালতের মামলা, রেলওয়ের রাজস্ব আদায়ের হিসাব, টেন্ডারপ্রক্রিয়া, ঠিকাদার সংগঠনের বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা দাবি করেছেন।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com