ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) খন্দকার মাহবুব আলমকে ঘিরে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, দ্রুত পদোন্নতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র ও কাজ বণ্টনে প্রভাব বিস্তার, ঘুষ-দুর্নীতি এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগকারীরা তার সম্পদ, পদোন্নতি, প্রকল্পে ভূমিকা এবং দরপত্র প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
খন্দকার মাহবুব আলম বিভিন্ন সময়ে ডিএনসিসির জোন-৩-এর নির্বাহী প্রকৌশলী এবং ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৯ সালে তিনি সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার (সিভিল) পদে দায়িত্ব পান। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১১ মার্চ তাকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তার ক্যারিয়ার অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অন্যতম কারণ হিসেবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচির ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা হিসেবেও তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের মে মাসে তিনি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মাহবুব আলম নিজেও সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক এবং জন্মশতবার্ষিকীর ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে তার দাবি, ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তার দায়িত্ব তাকে সরকারের পক্ষ থেকেই দেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, রাজনৈতিকভাবে একটি নির্দিষ্ট ঘরানার সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল ও উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্বে বহাল থাকলেন এবং পরবর্তীতে আরও গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেলেন। ২০২৬ সালে তাকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেওয়ার সময়টিও এ কারণে আলোচনায় এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাবেক ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলামের মেয়াদে মাহবুব আলম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। তাকে সাবেক মেয়রের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত কর্মকর্তা হিসেবে বর্ণনা করেছেন কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। পরবর্তীতে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টনের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব সম্পর্কের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব পাওয়ার পর দরপত্র ও উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তে মাহবুব আলমের প্রভাব বেড়েছে। তবে ওই কর্মকর্তার বক্তব্যও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ডিএনসিসির বড় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বণ্টনে প্রভাব বিস্তার। অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত ডিআরএসপি (DRSP) প্রকল্পের প্রায় ৮২২ কোটি টাকার কাজের মধ্যে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার কাজ আওয়ামী লীগপন্থী বা রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট হিসেবে বিবেচিত ঠিকাদারদের দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান, ঠিকাদার নির্বাচন এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় মাহবুব আলমের প্রভাব ছিল। তবে এ দাবির পক্ষে প্রকাশ্যে নির্দিষ্ট কোনো নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথিপত্র পর্যালোচনা ও স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে খন্দকার মাহবুব আলমের ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকায় তার একাধিক ফ্ল্যাট ও দোকান রয়েছে। তার নামে সাতটি ফ্ল্যাট ও কয়েকটি দোকান থাকার পাশাপাশি দুটি দামি বা বিলাসবহুল গাড়ি থাকারও দাবি করা হয়েছে। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, তার একটি ডুপ্লেক্স অ্যাপার্টমেন্ট সাজাতে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের মূল প্রশ্ন, একজন সরকারি প্রকৌশলীর বৈধ আয় দিয়ে এসব সম্পদ অর্জন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব কি না এবং সম্পদগুলোর অর্থের উৎস কী। এ বিষয়ে তার আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তি ক্রয়ের নথি যাচাই করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।
এ ছাড়া মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঘুষের লেনদেন, অর্থের পরিমাণ, ঘুষদাতা বা প্রত্যক্ষ প্রমাণের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) পদে পদোন্নতি পান এবং পরবর্তী সময়ে সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার (সিভিল) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৬ সালের ১১ মার্চ তাকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অভিযোগকারীরা বলছেন, এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দুদক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত তার সম্পদ, পদোন্নতির নথি, ডিআরএসপি প্রকল্পের দরপত্র ও কাজ বণ্টন এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন তদন্ত করা। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা, তা স্পষ্ট হবে বলে তারা মনে করছেন।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com