টাকা দিলেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাতক্ষীরা সদর ভূমি অফিসের পিয়ন শফিউর রহমান শফির বিরুদ্ধে। ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (নায়েব) শর্মিষ্ঠা সরকারকে প্রভাবিত করে নামজারি ও খাজনা দাখিলার প্রতিবেদন জালিয়াতি এবং জাল দলিলের মাধ্যমে জমি নামজারি করানোর একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে দুই লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে দুটি জাল দলিলের বিপরীতে নামজারি অনুমোদনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ধুলিহরের কালাম ও দেবহাটার করিম মুহুরীসহ কয়েকজনকে নিয়ে শফিউর রহমান শফি একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জাল দলিল ব্যবহার করে নামজারি করানোসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা পাইয়ে দেওয়ার নামে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকারের ব্যক্তিগত ও গোপনীয় কিছু তথ্য জেনে যাওয়ার পর তা ব্যবহার করে তাকে চাপের মধ্যে রাখেন শফি—এমন অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দুই লাখ টাকার ঘুষের একটি চুক্তিতে নায়েব শর্মিষ্ঠা এক লাখ টাকা এবং শফির সিন্ডিকেটের সদস্যরা বাকি এক লাখ টাকা নেন।
সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ফুটেজে সদর ভূমি অফিসের সিঁড়ির নিচে বসে শফিউর রহমান শফিকে ঘুষের টাকা গুনতে দেখা গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
জাল দলিলের মাধ্যমে সম্পন্ন করা কয়েকটি নামজারির বিষয়ে সাতক্ষীরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তথ্য যাচাই করা হলে সংশ্লিষ্ট দলিলের তথ্য বালাম বইয়ের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। এমনকি সংশ্লিষ্ট দলিল নম্বরের বালাম বইয়ের পৃষ্ঠা ছেঁড়া অবস্থায় পাওয়া গেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
শফিউর রহমান শফি ১৬-১৭ হাজার টাকা বেতন স্কেলের একজন সরকারি কর্মচারী হলেও তার দৃশ্যমান স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা বলে অভিযোগ উঠেছে। সাতক্ষীরা শহরের পারকুকরালী এলাকায় তিনটি এসি সংবলিত দোতলা বাড়ি রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
এছাড়া সাতক্ষীরা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে কয়েক একর কৃষিজমি এবং খুলনায় শ্বশুরবাড়ির এলাকায় কোটি টাকা মূল্যের প্লট থাকার অভিযোগও রয়েছে। ঢাকার একটি নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা ছেলের শিক্ষা ও ফ্ল্যাট ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করেন বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সম্প্রতি দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার সময় সাত লাখ টাকা দেনমোহর পরিশোধের বিষয়টিও সামনে এসেছে। এসব সম্পদের উৎস ও ব্যয়ের সামর্থ্য নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সাধারণ সেবাগ্রহীতারা সরাসরি আবেদন করলে কিংবা দাবি অনুযায়ী অর্থ না দিলে তাদের ফাইল আটকে রাখা হয়। কখনো কখনো সার্ভার থেকে আবেদন বাতিল করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ভুক্তভোগী আমীন রহমান ও আবুল হোসেনের অভিযোগ, নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকারের নাম ব্যবহার করে শফি বিভিন্ন ফাইলের জন্য সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা আদায় করেন।
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শফিউর রহমান শফি। তিনি দাবি করেন, তার সম্পদ বৈধ আয়ের মাধ্যমে অর্জিত। একই সঙ্গে ঘুষের অর্থের বড় অংশ নায়েব শর্মিষ্ঠা নিজেই নিতেন বলেও দাবি করেন তিনি।
শফি আরও দাবি করেন, খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে তার প্রভাবশালী যোগাযোগ রয়েছে। এমনকি সেখানে অর্থ ব্যয় করে তিনি সাতক্ষীরা সদর ভূমি অফিসে এসেছেন এবং তাকে সরানোর ক্ষমতা এসিল্যান্ডেরও নেই বলে দাবি করেছেন তিনি।
অন্যদিকে, শফিউর রহমান শফির বিরুদ্ধে জাল দলিল, ঘুষ গ্রহণ, নামজারি বাণিজ্য এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় সচেতন মহল ও সেবাগ্রহীতারা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, অভিযোগগুলো সঠিক হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভূমি অফিসের সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি ও অনিয়ম কমবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com