বিভিন্ন অনিয়ম, এখতিয়ারবহির্ভূত অভিযান, উৎকোচ দাবি, আটক ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মোহাম্মদ তৌফিকুল ইসলামকে সরকারি চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। তিনি বর্তমানে বগুড়া ৪-এপিবিএনে কর্মরত ছিলেন।
১২ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোরশেদ চৌধুরীর স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ আদেশ জারি করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের এপিবিএন ক্যাম্পের ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তৌফিকুল ইসলাম একাধিক গুরুতর অনিয়মে জড়িয়েছেন। এর মধ্যে ২০২২ সালের ২৫ অক্টোবর কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ক্যাম্প ত্যাগ করে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মাদারীগঞ্জ বাজারে গিয়ে সাদা পোশাকে ‘তুষার টেলিকম’ নামের একটি মোবাইল ফোনের দোকানে অভিযান চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
ওই অভিযানে ১১টি ভারতীয় মোবাইল ফোন জব্দ করে বাগমারা থানার এক উপপরিদর্শকের (এসআই) কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর পরদিন, ২৬ অক্টোবর রাতে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার সরেরহাট গ্রামের সোহাগ আহমেদের বাড়িতে সাদা পোশাকে অভিযান ও তল্লাশি চালানোর অভিযোগ ওঠে তৌফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। সেখানে সোহাগ আহমেদ ও তার মাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে এক লাখ টাকা উৎকোচ দাবি করা এবং টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সোহাগ আহমেদ ও স্থানীয় ইউপি সদস্য কালাম সরকারকে আটক করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরে সোহাগ আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে বাঘা বাজারের ডাচ-বাংলা ব্যাংকের একটি এটিএম বুথ থেকে তার মায়ের ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করে ২০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। বাকি টাকা আদায়ের জন্য ওই এটিএম কার্ড নিজের কাছে রেখে দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনার পর তৌফিকুল ইসলাম ও তার সঙ্গে থাকা এক এসআইকে স্থানীয় লোকজন ‘ভুয়া পুলিশ’ সন্দেহে ঘেরাও করেন। পরে খবর পেয়ে বাঘা থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। একই ঘটনায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সোহাগ আহমেদের মাকে মোবাইল ফোনে চাপ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তদন্তে উঠে আসে।
এ ছাড়া ২০২২ সালের নভেম্বরে ‘সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন’ প্রশিক্ষণে অংশ নিতে গিয়ে কোর্স অসমাপ্ত রেখেই কর্মস্থলে ফিরে আসার অভিযোগ রয়েছে তৌফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। চিকিৎসাজনিত কারণে বিশ্রামে থাকার সময়ও কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সাদা পোশাকে অভিযান পরিচালনার অভিযোগ তদন্তে উঠে আসে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ১১ নভেম্বর সন্ধ্যায় বাঘার সরেরহাট বাজার থেকে ইউপি সদস্য কালাম সরকার ও মনোয়ারা বেওয়াকে আটক করে বগুড়া ৪-এপিবিএন সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের আটকের সময় পিস্তল দিয়ে মাথায় আঘাত করার অভিযোগও আনা হয়েছে। এ সময় মনোয়ারা বেওয়ার ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন নিয়ে আর ফেরত দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তর ২০২৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর তৌফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে। পরে ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতিপরায়ণতা’র অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়।
বিভাগীয় মামলায় তৌফিকুল ইসলাম লিখিত জবাব দেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত শুনানির আবেদন করেন। ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তার ব্যক্তিগত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। পরে অভিযোগ তদন্তে একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর দেওয়া প্রতিবেদনে তৌফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনা ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতিপরায়ণতা’র অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে মত দেন। এরপর তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়ে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এর জবাবে তিনি ১১ মার্চ লিখিত বক্তব্য দেন।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, তদন্ত প্রতিবেদন, তৌফিকুল ইসলামের জবাব এবং অভিযোগগুলোর গুরুত্ব পর্যালোচনা করে তাকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) পরামর্শ চাওয়া হলে গত ২৫ জুন কমিশনও তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার পক্ষে মত দেয়।
পরবর্তীতে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে রাষ্ট্রপতি গত ৯ আগস্ট এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৪(৩)(খ) বিধি অনুযায়ী মোহাম্মদ তৌফিকুল ইসলামকে সরকারি চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com