অভাবের তাড়নায় একসময় ঢাকায় এসে ফুটপাতে পান বিক্রি করতেন ইউসুফ। ১৯৯৮ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে গাড়িচালক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। কয়েক বছর পর চাকরি রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ১৬তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন চলতে থাকে। তবে বর্তমানে ব্যবসা, একাধিক গাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি ও বাড়িসহ বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনা, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রভাব খাটিয়ে এসব সম্পদ গড়ে তুলেছেন ইউসুফ। তার কিছু সম্পদ নিজের নামে এবং কিছু পরিবারের সদস্যদের নামে রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে তথ্য পাওয়া গেছে। চাকরিজীবনে বরখাস্ত হওয়া ও একটি মামলায় কারাভোগের ঘটনাও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ইউসুফের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার চর মোহনা গ্রামে। কৃষক মো. আমিনের বড় ছেলে ইউসুফ লেখাপড়া করতে না পেরে অভাবের কারণে ঢাকায় আসেন। আসাদগেট এলাকায় পান বিক্রির পাশাপাশি হালকা যান চালানো শেখেন তিনি।
১৯৯৮ সালের ৪ জুন ‘১৮ জেলা হাসপাতাল প্রকল্প’ চালু হলে সেখানে গাড়িচালক হিসেবে চাকরি পান ইউসুফ। প্রথম কর্মস্থল ছিল নাটোর সদর হাসপাতাল। প্রায় তিন বছর পর তিনি প্রকল্পের প্রধান কার্যালয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বদলি হয়ে আসেন। পরে চাকরি রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত হলে তার পোস্টিং হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে তিনি অ্যাম্বুলেন্স চালাতেন।
২০১৩ সালে তৎকালীন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়ার সঙ্গে ইউসুফের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অ্যাম্বুলেন্স চালানোর পাশাপাশি তিনি ওই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করতেন এবং তার নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন তদবির করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সরকারি অ্যাম্বুলেন্স ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কাজে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
২০১৩ সালের ২০ অক্টোবর প্রশিক্ষণের জন্য কয়েকজন নার্সকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার পর ইউসুফ সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে করে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে একটি অনুষ্ঠানের বিলবোর্ড, ব্যানার, গেঞ্জি ও লিফলেট নিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। পরে তার সঙ্গে তৎকালীন সহকারী পরিচালক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়ার দূরত্ব তৈরি হয়।
এ ঘটনায় তৎকালীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ড্রাইভার সমিতির সভাপতি মালেকের কাছে অভিযোগ করা হলেও তিনি ইউসুফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে প্রশ্রয় দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে ইউসুফকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। একই সময়ে তার বিরুদ্ধে একটি সন্ত্রাসবিরোধী মামলা হয় এবং ওই মামলায় প্রায় দুই মাস কারাভোগ করেন তিনি।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালে মালেকের মাধ্যমে তদবির করে ইউসুফ চাকরি ফিরে পান বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) তার পোস্টিং হয়। সেখানে বেতন-ভাতা তুললেও তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হাসপাতাল শাখার উপসচিব এবং পরে যুগ্ম সচিবের গাড়িচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত তিনি যুগ্ম সচিবের গাড়ি চালিয়েছেন বলে জানা গেছে।
৫ আগস্টের পর আবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পোস্টিং পান ইউসুফ। এরপর নিজেকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য, বদলির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা এবং আউটসোর্সিং কর্মীদের চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন কর্মচারী।
বর্তমানে তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন রুমির গাড়িচালক হিসেবে কর্মরত। নির্বাচিত না হয়েও নিজেকে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য বিভাগীয় সরকারি গাড়িচালক কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, ইপিআই, আইপিএইচ, আইইডিসিআরসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বদলি ও অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করেন ইউসুফ। তার পদ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব দেখিয়ে কর্মচারীদের চাপের মধ্যে রাখার অভিযোগও রয়েছে।
সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক দলের স্থানীয় একটি পদে দায়িত্ব পালন করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার বিধিনিষেধের সঙ্গে বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে ‘ফাহিম এন্টারপ্রাইজ’ নামে ইউসুফের একটি রেন্ট-এ-কার ব্যবসার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ও ভিজিটিং কার্ডে মালিক হিসেবে মো. ইউসুফের নাম ও তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের অ্যাম্বুলেন্স, কোস্টার, মাইক্রোবাস ও অন্যান্য যানবাহন ভাড়ার কথা বলা হয়েছে।
পরিচয় গোপন করে ভাড়াটিয়া সেজে ইউসুফের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তার ছয়টি ২৯ আসনের কোস্টার বাস রয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন। প্রতিটির আনুমানিক মূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। এ ছাড়া পাঁচটি হায়েস গাড়ি রয়েছে, যার প্রতিটির আনুমানিক মূল্য ৪২ থেকে ৪৬ লাখ টাকা। চারটি অ্যাম্বুলেন্সও রয়েছে বলে জানা গেছে।
সরকারি চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি তার পরিবারের নামে থাকা সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তার স্ত্রীর নামে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের শেরেবাংলা নগর উত্তর এলাকায় একটি ফ্ল্যাট এবং শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে আরেকটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া কাওরান বাজারে তার দুটি ফলের আড়ত রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, যেগুলো তার ভাই দেখভাল করেন। আশুলিয়ার জামগড়া বাজারের পূর্ব পাশে একটি নার্সিং ইনস্টিটিউটসংলগ্ন এলাকায় তার কেনা জমি ও বাড়ির তথ্যও পাওয়া গেছে। এর বাইরে তার নামে-বেনামে আরও সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
১৯৯৭ সালের পে-স্কেল অনুযায়ী ১৬তম গ্রেডের হালকা গাড়িচালকের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ২ হাজার ৩৭৫ টাকা। বিভিন্ন ভাতা যুক্ত হলে সে সময় মোট প্রারম্ভিক আয় প্রায় ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা হওয়ার কথা। পরবর্তী সময়ে ২০০৫, ২০০৯ ও ২০১৫ সালের জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হয়।
সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালের ৪ জুন সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর প্রায় ২৯ বছরের কর্মজীবনে ইউসুফের সরকারি চাকরি থেকে মোট আয় আনুমানিক এক কোটি টাকা বা তার কিছু বেশি হতে পারে। এর বিপরীতে তার নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা গাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি, বাড়ি ও ব্যবসার তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কয়েকজন গাড়িচালক অভিযোগ করেন, তৃতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির বেতন দিয়ে যেখানে সংসার চালানোই কঠিন, সেখানে ইউসুফের একাধিক গাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি ও ব্যবসার মালিক হওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তারা তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানী দলের সদস্য ও লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি সরেজমিনে রায়পুর উপজেলার চর মোহনা গ্রামে ইউসুফের বাড়িতে গিয়ে তার পুরোনো একটি ছোট টিনের ঘর দেখতে পান। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় পরিবারটির আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না।
ইউসুফের এক চাচাতো ভাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তার বাবা মাটি কাটা ও কৃষিকাজ করতেন। একসময় পরিবারটির এক হাজার টাকা জোগাড় করতেও কষ্ট হতো। বর্তমানে ইউসুফের গাড়ি-বাড়ি ও বিপুল সম্পদ থাকলেও এসব সম্পদের উৎস সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন রুমির কাছে ইউসুফের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি প্রতিবেদককে ইউসুফ সম্পর্কে ইতিবাচক কোনো তথ্য জানা থাকলে তা অনুসন্ধানের পরামর্শ দেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের সঙ্গে দুই দিনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে সহকারী পরিচালক (কো-অর্ডিনেটর) ডা. নুরুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগের বিষয়গুলো শোনেন এবং মহাপরিচালককে অবহিত করার কথা জানান।
দুর্নীতি বা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তার মতে, কোনো সরকারি কর্মচারীর সম্পদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সম্পদের উৎস যাচাই করা উচিত। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগগুলোর মধ্যে সম্পদ অর্জন, সরকারি চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রভাব বিস্তারের বিষয়গুলো স্বাধীনভাবে যাচাই ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com