একটি ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন পূরণ করতে কেউ বিক্রি করেছেন পৈতৃক জমি, কেউ নিয়েছেন ব্যাংকঋণ, আবার কেউ জীবনের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় তুলে দিয়েছেন আবাসন প্রতিষ্ঠানের হাতে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সেই ফ্ল্যাট বুঝে না পেয়ে বছরের পর বছর অপেক্ষা, আইনি জটিলতা এবং অসমাপ্ত ভবনের কারণে ভোগান্তিতে পড়ার অভিযোগ উঠেছে রাজধানীর আবাসন প্রতিষ্ঠান ডম-ইনো লিমিটেডের বিভিন্ন প্রকল্পের ক্রেতা ও জমির মালিকদের কাছ থেকে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ডম-ইনোর বিভিন্ন প্রকল্পে ফ্ল্যাট হস্তান্তরে দীর্ঘসূত্রতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, চুক্তির শর্ত নিয়ে বিরোধ এবং অনুমোদিত নকশা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। এসব অভিযোগের কয়েকটি ইতোমধ্যে আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে এবং কিছু বিষয় বর্তমানে বিচারাধীন।
ফ্ল্যাট ক্রেতাদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়ার প্রত্যাশায় তারা দীর্ঘদিন আগে অর্থ পরিশোধ করলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। ফলে একদিকে বিনিয়োগ করা অর্থ আটকে আছে, অন্যদিকে ভাড়া বাসায় থেকে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। যৌথ উন্নয়ন চুক্তির আওতায় জমি দেওয়া কিছু মালিকও প্রতিশ্রুত সুবিধা ও ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর নয়াপল্টনে বহুতল ভবন নির্মাণের একটি প্রকল্পেও ডম-ইনোর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জমির মালিকদের দাবি, নির্মাণকাজ চলমান থাকা অবস্থায় ফ্ল্যাট বরাদ্দের নামে আগাম অর্থ সংগ্রহ করা হয় এবং ভবনের প্রকৃত ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি ফ্ল্যাট বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। এ নিয়ে জমির মালিকরা হাইকোর্টে রিট করলে আদালত জমির মালিকদের প্রাপ্য ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত ডম-ইনোর কোনো ফ্ল্যাট বিক্রি বা হস্তান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মিরপুর-১০-এর সি-ব্লকের ২১ নম্বর সড়কের ১০ নম্বর বাড়ির প্রকল্প নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। প্রায় এক যুগ আগে শুরু হওয়া সাততলা ভবনটির নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতির কারণে জমির মালিক নিজ উদ্যোগে ভবনের দ্বিতীয় তলায় গ্লাস স্থাপন করে সেখানে ব্যক্তিগত মালামাল সংরক্ষণ করছেন বলে জানা গেছে।
ডম-ইনোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগের একটি শান্তিনগরের ২০ নম্বর প্রকল্পকে ঘিরে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০০৮ সালে শুরু হওয়া ১৯ তলা ভবনটির নির্মাণকাজ দীর্ঘ সময়েও শেষ হয়নি। একপর্যায়ে ১৩৬ জন ফ্ল্যাট ক্রেতা ডম-ইনোর প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও নিরাপত্তাকর্মীদের প্রকল্প থেকে সরিয়ে দিয়ে নিজেদের উদ্যোগে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ফ্ল্যাট মালিকদের অভিযোগ, রাজউকের অনুমোদন ছিল ১৯ তলা ভবনের জন্য। কিন্তু অনুমোদন ছাড়াই ভবনটি ২৫ তলা পর্যন্ত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য পুরোনো পিলারের সঙ্গে নতুন পিলার যুক্ত করে কাঠামো পরিবর্তনের কাজ শুরু করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে অনুমোদিত নকশা ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রে কারসাজির মাধ্যমে ভবনটিকে ২৫ তলা হিসেবে দেখানোর অভিযোগও করেছেন তারা।
এ ছাড়া অনুমোদিত ১৯ তলার ওপরে আরও ১৬টি ফ্ল্যাট বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ফ্ল্যাটের ক্রেতারাও বর্তমানে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে ১৩৬ জন ফ্ল্যাট ক্রেতা নিজেদের উদ্যোগে নির্মাণকাজ পরিচালনা করছেন। তবে কাজ এগিয়ে নিতে বর্তমানে বিদ্যুৎ সংযোগ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্লটটি এখনো ডম-ইনোর নামে নিবন্ধিত থাকায় প্রতিষ্ঠানটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থায়ী বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
পরে ফ্ল্যাট মালিকরা নতুন সংযোগ অথবা পুরোনো সংযোগ পুনঃস্থাপনের জন্য ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) কাছে আবেদন করলেও তা নাকচ করা হয়। ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুহিবুল্লাহ বলেন, প্লট-সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই এবং ডম-ইনোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করা মিটারে পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া কিংবা নতুন সংযোগ প্রদান সম্ভব নয়।
ফলে নিজেদের অর্থায়নে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও মৌলিক সেবার অভাবে নতুন করে সমস্যায় পড়েছেন ফ্ল্যাট মালিকরা।
ডম-ইনোর সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সালাম লিটনের নেতৃত্বে গ্রাহকদের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতারণা করা হয়েছে এবং অধিকাংশ প্রকল্প সময়মতো হস্তান্তর করা হয়নি। রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে গ্রাহকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তবে সাবেক ওই কর্মকর্তার এসব বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আবাসন খাতের বিশেষজ্ঞ জান্নাতুর রহমান বলেন, কোনো আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, প্রকল্পের অনুমোদন, জমির বৈধতা এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর নজরদারি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ডম-ইনো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সালাম লিটনের বক্তব্য এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর মধ্যে যেসব বিষয় আদালতে বিচারাধীন, সেগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। তবে ভুক্তভোগী ক্রেতা ও জমির মালিকরা তাদের বিনিয়োগ, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং চুক্তি অনুযায়ী প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com