সরকারি হাসপাতালগুলোতে এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রামসহ বিভিন্ন রোগনির্ণয় (রেডিও ইমেজিং) যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলোর বড় একটি অংশ নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে না। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। একই সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জরুরি ও প্রয়োজনীয় ওষুধেরও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। বুধবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য-ব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী সেবা নিশ্চিত করতে ব্যয়দক্ষতার একটি দ্রুত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। সাত সদস্যের গবেষক দলের নেতৃত্ব দেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। গবেষণাটিতে অর্থায়ন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট।
২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জাতীয় লক্ষ্যকে সামনে রেখে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং কোথায় কী ধরনের ঘাটতি রয়েছে, তা মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। নয় মাস ধরে দেশের আট বিভাগের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে জরিপ, সাক্ষাৎকার ও নথিপত্র পর্যালোচনার মাধ্যমে এ গবেষণা সম্পন্ন করা হয়। গবেষকেরা উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে প্রাথমিক, জেলা হাসপাতালকে মাধ্যমিক এবং মেডিকেল কলেজ ও একটি বিশেষায়িত হাসপাতালকে তৃতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করেছেন। নমুনা সীমিত হওয়ায় গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, জেলা, উপজেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মিলিয়ে পর্যালোচিত ২২টি প্রতিষ্ঠানের রোগনির্ণয় যন্ত্রপাতির ৫২ শতাংশ গত এক বছরে একবারও ব্যবহার করা হয়নি। সব পর্যায়ের হাসপাতালে কাগজে-কলমে রোগনির্ণয় সেবার প্রাপ্যতা ৬৫ শতাংশ হলেও গত এক বছরে নিয়মিত সেবা মিলেছে মাত্র ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে। জেলা হাসপাতালগুলোতে এ ধরনের সেবার প্রাপ্যতা ৮৫ শতাংশ হলেও বাস্তবে নিয়মিত সেবা চালু ছিল মাত্র ৩৩ শতাংশ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার প্রাপ্যতা ৪৬ শতাংশ হলেও নিয়মিত সেবা পাওয়া গেছে ১৭ শতাংশ ক্ষেত্রে। মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে এ হার ছিল যথাক্রমে ৫৪ ও ২৫ শতাংশ।
গবেষণা অনুযায়ী, রোগনির্ণয় সেবা ব্যাহত হওয়ার প্রধান কারণ যন্ত্রপাতি অকেজো থাকা। মোট ৭৯ শতাংশ ক্ষেত্রে এই সমস্যার কারণে সেবা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এছাড়া প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে ১৪ শতাংশ এবং প্রশিক্ষিত মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের অভাবে ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে সেবা ব্যাহত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে অনুমোদিত ৬ হাজার ৪০৬টি মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ৩ হাজার ৮৯২ জন। অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শূন্য পদের হার ২৭ শতাংশ, জেলা হাসপাতালে ১২ শতাংশ এবং মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ৩৬ শতাংশ। ফলে অনেক হাসপাতালেই আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও দক্ষ জনবলের অভাবে সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
গবেষণায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধেরও বড় ধরনের সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে প্রয়োজনের তুলনায় ওষুধের মজুত মাত্র ১২ শতাংশ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ হার ২৩ শতাংশ এবং জেলা হাসপাতালে ২৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ওষুধের গড় প্রাপ্যতা মাত্র ২২ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ হওয়া অধিকাংশ ওষুধ সরকারি প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) থেকে এলেও চাহিদা পূরণে ৩৩ শতাংশ ওষুধ বাইরের উৎস থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। আরও ৫ শতাংশ ওষুধ আসে অন্যান্য উৎস থেকে। ফলে কেন্দ্রীয় সরবরাহ ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে হাসপাতালগুলোকে বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে গজ, তুলা, সিরিঞ্জ ও গ্লাভসের মতো নিয়মিত ব্যবহৃত সামগ্রী অধিকাংশ হাসপাতালে থাকলেও জরুরি চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অনেক সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে টুর্নিকেট, ৫৫ শতাংশে ব্যাগ-ভাল্ভ-মাস্ক (রিসাসিটেটর) এবং ৪১ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে নবজাতকের নাভির ক্ল্যাম্প পাওয়া যায়নি।
ল্যাব পরীক্ষার ক্ষেত্রে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালের চিত্র তুলনামূলক ভালো হলেও মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার প্রাপ্যতা এবং সারা বছর নিয়মিত সেবা চালুর হার ৪৩ থেকে ৪৫ শতাংশে নেমে এসেছে। গবেষণায় রিএজেন্টের ঘাটতি, যন্ত্রপাতি বিকল থাকা এবং দক্ষ জনবলের অভাবকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জরিপে অন্তর্ভুক্ত সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মোট বাজেটের ৮৫ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে। জেলা হাসপাতালগুলোতে বাজেট ব্যয়ের হার ছিল সবচেয়ে কম, ৭৮ শতাংশ। অর্থবছর শেষে ৯৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের কিছু অর্থ অব্যয়িত থেকে গেছে। সাধারণ সরঞ্জাম কেনার জন্য বরাদ্দ অর্থের মাত্র ২৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। ভ্রমণ ও স্থানান্তর খাতে ব্যয়ের হার ছিল ৬৮ শতাংশ এবং পেশাগত সেবা ও সম্মানী খাতে ৫৯ শতাংশ।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, গত দুই বছরে ৮৪ দশমিক ২ শতাংশ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ পেলেও তাঁদের মধ্যে মাত্র ৪০ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে সেই প্রশিক্ষণের জ্ঞান কার্যকরভাবে প্রয়োগ করেছেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পরিকল্পনার অভাবে বহু দামী চিকিৎসা যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে আছে। অনেক হাসপাতালে যন্ত্র থাকলেও তা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় টেকনোলজিস্ট নেই। তিনি আরও বলেন, পরিকল্পনাহীন কেনাকাটা এবং দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে অতীতে জনগণের অর্থের অপচয় হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানো এবং কমিশনভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থার মতো অনিয়ম বন্ধ না হলে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোই একমাত্র সমাধান নয়; বরং বরাদ্দের অর্থকে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবায় রূপান্তর করার সক্ষমতা গড়ে তোলাই সবচেয়ে জরুরি। এ লক্ষ্যে তিনি স্বল্পমেয়াদে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ, বাজেট ব্যয়ের খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ বাধ্যতামূলক করা, সমন্বিত ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা চালু এবং সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া সহজ করার সুপারিশ করেন। পাশাপাশি মধ্যমেয়াদে পেশাদার হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদে ইডিসিএল আধুনিকায়ন, কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ও কেন্দ্রীয় চিকিৎসা সরঞ্জামাগারের (সিএমএসডি) বিতরণব্যবস্থা আরও কার্যকর করার পরামর্শ দেন।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com