বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকোমোটিভ সচল রাখতে ব্যবহৃত ট্র্যাকশন মোটর কেনা ও মেরামতকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রের শর্তে অস্বাভাবিক পরিবর্তন এনে প্রতিযোগিতা সীমিত করা, নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং প্রকল্পে ভ্যারিয়েশনের মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে সরকারি অর্থের অপচয় ও কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে রেলওয়ের একাধিক প্রকল্প, দরপত্র এবং আর্থিক নথিপত্র খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের (সিআরবি) চিফ কন্ট্রোলার অব স্টোরস দপ্তরের অধীনে ২৩০০, ২৪০০, ৬০০০ ও ৬১০০ সিরিজের লোকোমোটিভের ৩৪টি ট্র্যাকশন মোটর মেরামতের জন্য চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি প্রায় ৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, শুরুতে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য অন্তত ৩০ লাখ টাকার সমমূল্যের কাজ সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা চাওয়া হলেও পরে সেই শর্ত বাড়িয়ে ৩ কোটি টাকা করা হয়।
সরকারি ক্রয়বিধিতে একই ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা চাওয়ার বিধান থাকলেও এই দরপত্রে কাজের মোট মূল্যের ৫০ শতাংশ সমপরিমাণ অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়। রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, এমন কঠোর শর্ত আরোপের ফলে ছোট ও মাঝারি দেশীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ে এবং একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
রেলওয়ের নথি অনুযায়ী, কারিগরি মূল্যায়নের পর শ্রীজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ ৬ কোটি ৪৫ লাখ ৫২ হাজার ৬০৪ টাকায় কাজটি পায়, যা দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি।
এদিকে ট্র্যাকশন মোটর মেরামতের পাশাপাশি রেলের ২০০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ ও ১৫০টি যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহ প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্প পরিচালক ও মহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বর্তমানে রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন ভ্যারিয়েশনের মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ান। পাশাপাশি অনুমোদনবিহীন এয়ার ব্রেক ব্যবহার এবং বদলি বাণিজ্যের অভিযোগও দুদকে জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের বিল-ভাউচার, নোটশিট, একনেকের অনুমোদনসহ বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করছে দুদক।
অনুসন্ধানে রেলওয়ের ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের সঙ্গে আফসার আলী বিশ্বাস ও আফজাল হোসেনের নামও উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, পাথর সরবরাহ, ট্র্যাকশন মোটর ও আর্মেচার মেরামতের নামে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে তার একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরে পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য যাচাইয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সহায়তা চাওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বাধীন তদন্ত দল ইতোমধ্যে ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সম্পাদিত চুক্তি, দরপত্র মূল্যায়ন, বিল-ভাউচার এবং সংশ্লিষ্ট নথি তলব করেছে। রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো চিঠিতে সরকারি অর্থের অপচয় এবং অসাধু চক্রের যোগসাজশের অভিযোগ তদন্তের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন বলেন, দুদক কোন বিষয়ে বা কী কারণে তদন্ত করছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন। তিনি দাবি করেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর এ ধরনের কোনো অনিয়ম তার নজরে আসেনি।
তিনি আরও বলেন, কয়েক বছর আগে পার্বতীপুর কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানায় (কেলোকা) ভারত থেকে আমদানি করা লোকোমোটিভের ট্র্যাকশন মোটর মেরামতের সময় শ্রীজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে সফলভাবে কাজ সম্পন্ন করেছিল। সেই অভিজ্ঞতার কারণেই প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী সময়ে সীমিত দরপত্রে একাধিক কাজ পায়। বর্তমানে উন্মুক্ত দরপত্রেও একই প্রতিষ্ঠান কাজ পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ট্র্যাকশন মোটর মেরামত অত্যন্ত বিশেষায়িত প্রযুক্তিনির্ভর কাজ হওয়ায় পূর্ব অভিজ্ঞতার শর্ত রাখা হয় এবং অনেক প্রতিষ্ঠান সেই শর্ত পূরণ করতে না পারায় কার্যকর দরদাতা হিসেবে বিবেচিত হয় না।
অন্যদিকে, ঠিকাদার আফসার আলী বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়ের বিভিন্ন ক্রয়কাজে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, চারটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গত প্রায় ১৭ বছরে তিনি দুই শতাধিক ফ্রেমওয়ার্ক কন্ট্রাক্ট পেয়েছেন। বড় কাজকে ছোট ছোট চাহিদাপত্রে ভাগ করে অনুমোদনের সীমার মধ্যে এনে শত শত কোটি টাকার কার্যাদেশ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া নিম্নমানের পাথর সরবরাহ, ট্র্যাকশন মোটর ও আর্মেচার মেরামতের কাজ নিয়ন্ত্রণ এবং আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরবর্তী দুই বছরে ২১টি ট্র্যাকশন মোটর মেরামতের কার্যাদেশ পাওয়ার বিষয়েও অভিযোগ উঠেছে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com