দেশের মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময়ের দায়িত্ব যে দপ্তরের কাঁধে, সেই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) নিজেই এখন এক চরম দুর্নীতিগ্রস্ত ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত! ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের প্রায় প্রতিটি সরকারি সংস্থায় যখন শুদ্ধি অভিযান আর সংস্কারের হাওয়া বইছে, তখন ডিএনসিতে চলছে ঠিক তার উল্টো চিত্র| অভিযোগের তীর বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) মো. হাসান মারুফের দিকে| গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি দায়িত্বে বসার পর থেকেই অধিদপ্তরের চাকা পেছনের দিকে ঘুরতে শুরু করেছে| বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর এবং বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’-এর চিহ্নিত নেতারা রাতারাতি নতুন ডিজির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সেজে গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী ও বেপরোয়া ‘বদলি বাণিজ্যের সিন্ডিকেট’|
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে লোভনীয় অঞ্চলে পদায়ন (প্রাইজ পোস্টিং), বদলি এবং বিভিন্ন স্পট থেকে মাসোহারা তোলার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এখন এই নিষিদ্ধ সিন্ডিকেটের কব্জায়| বিগত দেড় দশকে দলীয় দাপট দেখিয়ে পুরো অধিদপ্তরকে কোণঠাসা করে রাখা ৩১ ও ৩৫ সদস্যবিশিষ্ট ডিএনসি ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’ কমিটির শীর্ষ নেতারা পট পরিবর্তনের পর কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে ছিলেন| কিন্তু পরিস্থিতি একটু ঠান্ডা হতেই তারা নতুন মহাপরিচালক হাসান মারুফের প্রধান আস্থাভাজন হিসেবে প্রকাশ্য দিবালোকে মাঠে নেমেছেন|
অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশ্চিত করেছে যে, কাঙ্ক্ষিত পোস্টিং পেতে কর্মকর্তাদের এখন কোটি টাকার খেলা খেলতে হচ্ছে| আর এই পুরো বাণিজ্যের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন দুই শীর্ষ কর্মকর্তা—বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহ-সভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদক তথা উপ-পরিচালক (প্রশাসন) রাজীব মিনা (যার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার রাতইল ইউনিয়নের চাপ্তা গ্রামে) এবং এই নিষিদ্ধ পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক তথা ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোঃ মেহেদী হাসান| এদের সাথে যুক্ত রয়েছেন কয়েকজন সহকারী পরিচালক, যারা পূর্বে পলাতক সরকারের রাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ক্যাশিয়ার ও সাবেক একাধিক দুর্নীতিবাজ ডিজির (যেমন: মোঃ আব্দুস সবুর মন্ডল, মোঃ আজিজুল ইসলাম, মোঃ আহসানুল জব্বার, মোঃ আবদুল ওয়াহাব ভূঞা, মুস্তাকীম বিল্লাহ ফারুকী এবং খোন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান) অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন| এই পুরো চক্রটিই এখন ডিজি হাসান মারুফকে ঘিরে নতুন ‘আওয়ামী সিন্ডিকেট’ গড়ে তুলেছে|
অধিদপ্তরের এক ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা ভেবেছিলেন পট পরিবর্তনের পর ১৫ বছর ধরে বঞ্চিত থাকা সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তারা মূল্যায়ন পাবেন| কিন্তু ডিজি হাসান মারুফ যোগ দেওয়ার পর নিষিদ্ধ ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’-এর নেতারাই সব ফাইল প্রসেস করছেন এবং বদলি-পদায়নের তালিকা ˆতরি করে পোস্টিং নিশ্চিত করছেন| অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, গত কয়েক মাসে পরিদর্শক (ইনস্পেক্টর) ও সহকারী পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে নজিরবিহীন রদবদল করা হয়েছে| ডিএনসি-র অভ্যন্তরীণ সূত্রের খবর অনুযায়ী, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ জোনে বদলির জন্য ১৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা লেনদেন হচ্ছে এবং গুলশান, বনানী, উত্তরা ও নিকেতনের মতো অভিজাত এলাকার বারগুলো থেকে নিয়মিত মাসোহারা তোলার জন্য সিন্ডিকেটের নিজ লোক ছাড়া কাউকে পদায়ন করা হচ্ছে না| এমনকি ঢাকা মেট্রো, ঢাকা গোয়েন্দা শাখা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের মতো ‘প্রাইজ পোস্টিং’ পেতে কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের টাকা জমা দিতে হচ্ছে| যেসব বিতর্কিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অতীতে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মাদক ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল, এই সিন্ডিকেটের আশীর্বাদে তারাও বহাল তবিয়তে পার পেয়ে যাচ্ছেন|
এদিকে ডিজি হাসান মারুফ এই নিষিদ্ধ চক্রের চক্রব্যূহে জড়িয়ে পড়েছেন এবং নিজের ক্ষমতার ঢাল হিসেবে তাদের ব্যবহার করছেন বলে তীব্র অভিযোগ উঠেছে| তার এই স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে গত ১০ মে এক বিশাল মানববন্ধনও অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ক্ষুব্ধ জনতা ও কর্মকর্তারা তার পদত্যাগ দাবি করেন| ওই মানববন্ধনে বলা হয়, ফ্যাসিস্ট আমলে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে ডিজি হাসান মারুফ স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর ও কুৎসিত মন্তব্য করতেন| বর্তমানে তিনি তার মূল দায়িত্ব বাদ দিয়ে সারাদিন সচিবালয়ে পড়ে থাকেন নিজের 'সচিব' পদ বাগানোর তদবিরে|
যেখানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন, সেখানে পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা এই ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’ সিন্ডিকেট এবং বিতর্কিত ডিজি হাসান মারুফ কীভাবে মাদক নির্মূল করবেন—তা নিয়ে অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে| এই সব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফের মুঠোফোনে একাধিকবার কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি|
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com