স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেডের (এসবিএল) সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সামি আহমেদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বার্থের সংঘাত, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় তহবিল বণ্টনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বে থাকাকালে তিনি নিজেই একটি বেসরকারি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানে সরকারি অর্থায়নের ব্যবস্থা করেন এবং পরে সেই প্রতিষ্ঠানেই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে যোগ দেন। বিষয়টিকে সুশাসন বিশেষজ্ঞরা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় গুরুতর নৈতিক ও প্রশাসনিক প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে স্টার্টআপ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘হিসাব টেকনোলজিস’ (বর্তমানে ভারবেক্স) নামের একটি প্রতিষ্ঠানে দুই কোটি টাকা বিনিয়োগের চুক্তি অনুমোদন দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তৎকালীন এমডি সামি আহমেদ। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটিকে দ্রুত এক কোটি টাকা ছাড় করা হয়। পরে সামি আহমেদ নিজেই ওই প্রতিষ্ঠানের সিইও হিসেবে যোগ দেন, যা স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রস্তাব স্থগিত বা বাতিল হলেও হিসাব টেকনোলজিসের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী দ্রুততায় অর্থ ছাড় করা হয়। একই সময়ে স্টার্টআপ বাংলাদেশের তহবিল বণ্টনে রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত বিবেচনার অভিযোগও ওঠে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হিসাব টেকনোলজিস নিজেদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দিলেও প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একাধিক বর্তমান ও সাবেক কর্মীর দাবি, প্রতিষ্ঠানটির প্রচারিত অনেক সেবা প্রকৃতপক্ষে এআইভিত্তিক ছিল না; বরং প্রচলিত আইভিআর (IVR) ও স্বয়ংক্রিয় কল প্রযুক্তিকে এআই হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের নাম পরিবর্তন করে ‘ভারবেক্স’ রাখে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, নেতিবাচক ভাবমূর্তি থেকে বেরিয়ে আসতেই এই নাম পরিবর্তন করা হয়।
সূত্র জানায়, ২০২২ সালে স্টার্টআপ বাংলাদেশের এমডি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সামি আহমেদ বিনিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতেন। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছে। জুলাই আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে ‘টেন মিনিট স্কুল’-এর পাঁচ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব বাতিল করা হয়। একইভাবে শিক্ষা প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘শিখো’-র বিনিয়োগ প্রস্তাবও চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে বাতিল করা হয়।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একটি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘বঙ্গ’-এ পাঁচ কোটি টাকা বিনিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ‘বঙ্গ’ আয়োজিত ‘শার্ক ট্যাংক’ অনুষ্ঠানে স্টার্টআপ বাংলাদেশের পৃষ্ঠপোষকতাও দেওয়া হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানের প্রথম মৌসুমে অন্তত ১৪টি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকার বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদানের ঘোষণা দেওয়া হয়, যার অর্থের উৎস ছিল সরকারি মালিকানাধীন স্টার্টআপ বাংলাদেশের তহবিল।
সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় তহবিল ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা পরবর্তীতে সেই অর্থায়নপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে যোগ দিলে তা স্বার্থের সংঘাতের স্পষ্ট উদাহরণ। তাদের মতে, বিনিয়োগ অনুমোদন, অর্থ ছাড়, প্রতিষ্ঠান নির্বাচন এবং পরবর্তী নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি দায়িত্বে থেকে রাষ্ট্রীয় অর্থ বণ্টনে প্রভাব খাটিয়ে পরবর্তীতে সেই অর্থায়নপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়া গুরুতর নৈতিক ও প্রশাসনিক প্রশ্ন তৈরি করে। এর পেছনে কোনো পূর্ব সমঝোতা ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা উচিত।
অভিযোগের বিষয়ে হিসাব টেকনোলজিসের সহপ্রতিষ্ঠাতা মিও আহমেদ তাৎক্ষণিক মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তবে চেয়ারম্যান জোবায়ের আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে সামি আহমেদের সঙ্গে মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
স্টার্টআপ বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল হাই বলেন, বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে। তিনি বলেন, অভিযোগের বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ নির্বাচন এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সামি আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com