সরকারি স্থাপনায় আসবাবপত্র ও ইন্টেরিয়র সরবরাহে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রতিষ্ঠানের অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। বঙ্গভবন, বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল, আদালত ভবন, সার্কিট হাউস, মডেল মসজিদসহ গণপূর্ত অধিদপ্তরের আওতায় বাস্তবায়িত বিভিন্ন প্রকল্পে একই প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক অংশগ্রহণ সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের সুযোগ নিয়ে হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড সরকারি আসবাবপত্র সরবরাহ খাতে শক্ত অবস্থান তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক খোরশেদ আলমের বিরুদ্ধেও সরকারি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৬ সালে দেশের বিভিন্ন জেলা হাসপাতালকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও সংস্কার প্রকল্পের আওতায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম কাঠের কারখানা বিভাগ ১২টি পৃথক দরপত্র আহ্বান করে। গত ৮ জুন পর্যন্ত দরপত্র মূল্যায়নে হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড ১২টির মধ্যে ৮টিতে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়। তবে মূল্যায়ন শেষ হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র একটি কার্যাদেশ জারি হয়েছে। বাকি সাতটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কার্যাদেশ বিলম্বিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির শুরু হয়। এ লক্ষ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কাছেও লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি মো. রেজাউল করিম অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) জোন, প্রকল্প পরিচালক, প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেন। ওই আবেদনে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জোবায়ের বিন হায়দারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মডেল মসজিদ, সার্কিট হাউস, আদালত ভবনসহ একাধিক বড় সরকারি প্রকল্পে হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেডের ধারাবাহিক উপস্থিতি অতীতেও আলোচনা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তার অভিযোগ, শুরুতে কিছু প্রকল্পে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণে ভুয়া নথি ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটিকে সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন বড় প্রকল্পে ধারাবাহিকভাবে কাজ পাওয়ার মাধ্যমে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দরপত্রে অংশগ্রহণের পাশাপাশি কার্যাদেশ আটকে গেলে প্রশাসনিক চাপ তৈরিরও চেষ্টা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি প্রকল্পের বড় অংশ পাওয়ার অভিযোগ থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের তৎপরতা সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নও সামনে এনেছে।
এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জোবায়ের বিন হায়দার বলেন, দরপত্র মূল্যায়নের কাজ এখনও চলমান এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে কোনো কার্যাদেশ দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি দাবি করেন, সরকারি বিধি অনুসরণ করেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও ভিত্তিহীন।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কোনো একটি প্রতিষ্ঠান যদি দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি দরপত্রের উল্লেখযোগ্য অংশ পেয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তার মতে, একচেটিয়া আধিপত্যের অভিযোগ সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
সুশাসন বিশ্লেষক জান্নাতুর রহমান বলেন, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে দরপত্র মূল্যায়ন, কার্যাদেশ প্রদান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রভাব খাটানো বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত এক দশকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের আওতায় আসবাবপত্র সরবরাহসংক্রান্ত বড় প্রকল্পগুলোর দরপত্র মূল্যায়ন, কার্যাদেশ, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা হলে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় কোনো বিশেষ সুবিধার বলয় তৈরি হয়েছিল কি না, তার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com