
যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে শুল্ক ফাঁকি, পণ্য খালাসে অনিয়ম এবং সংঘবদ্ধ দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। এবার কাস্টমসের কার্গো শাখার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) মাইদুল ইসলাম-১ এবং আইআরএম (ওজিজি) শাখার কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম-২কে ঘিরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরির অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সিন্ডিকেট এই দুই কর্মকর্তার প্রভাবেই পরিচালিত হয়। পণ্য চালান আটকে রাখা, আত্মসাৎ, কাগজপত্রবিহীন পণ্য প্রবেশ এবং অনিয়মের মাধ্যমে পণ্য খালাসের ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে বেনাপোল স্থলবন্দরে দুর্নীতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এবং বিগত অর্থবছরে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কার্গো শাখার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম-১ এবং আইআরএম (ওজিজি) টিমের মাইদুল ইসলাম-২। অভিযোগ রয়েছে, মাইদুল ইসলাম-২ নিজস্ব অর্থায়নে ব্যবসা পরিচালনা করেন। স্থানীয় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকায় তার ভাইয়ের হার্ডওয়্যার ব্যবসার মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য আমদানি করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট পণ্য পরীক্ষার দায়িত্বে নিজেই থাকায় অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি একটি খৈলের চালান সংক্রান্ত অনিয়মের ঘটনাতেও তার নাম উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, দুই কর্মকর্তার যোগসাজশে এস এ ট্রেডার্স, প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনাল, হুদা এন্টারপ্রাইজ, কদর অ্যান্ড কোং, ওমর অ্যান্ড সন্স, নিরা এন্টারপ্রাইজ, ওভারসিজ ট্রেডিং করপোরেশন, ব্রাদার্স এক্সিম লিমিটেড, সোনালী সিঅ্যান্ডএফ লিমিটেড, রিমু এন্টারপ্রাইজ, করিম অ্যান্ড সন্স, সার্ভিস লাইন, মেসার্স আলতাফ অ্যান্ড সন্স এবং প্যারেন্টস ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস সেন্টার-এর বিভিন্ন কনসাইনমেন্ট কোটি কোটি টাকার ঘুষের বিনিময়ে ছাড় দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই দুই কর্মকর্তার স্বাক্ষর করা নথিপত্র পর্যালোচনা করলেই অনিয়মের প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে।
বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম-১-এর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বগুড়ার এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচয় দেন, শুল্ক ফাঁকি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। এ কারণে মাইদুল ইসলাম কোনো ধরনের প্রশাসনিক চাপকে গুরুত্ব দেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীরা আরও জানান, গত ১২ মার্চ ভারত থেকে মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস, বেবিওয়্যার ও প্রসাধনী সামগ্রী জব্দের পর সেসব পণ্য লোপাটের ঘটনায় মাইদুল ইসলামসহ একটি সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলেও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম-১ এবং বন্দরের আশিকুর রহমান রনি একই এলাকার হওয়ায় তারা ওজনে কারচুপি, জাল নথিপত্র প্রস্তুত এবং অনিয়মের মাধ্যমে পণ্য খালাসে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। এ সিন্ডিকেটকে বেনাপোল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক রতন পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অসাধু কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের কারণে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। সম্প্রতি কাস্টমস হাউস থেকে রাতের আঁধারে প্রায় ৩ কোটি টাকার পণ্য পাচারের ঘটনায় কাস্টমস কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জি বিজিবির হাতে আটক হন। এছাড়া ৬ অক্টোবর ২০২৫ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে কাস্টমস হাউসের রাজস্ব কর্মকর্তা শামীমা আক্তার আটক হন। এসব ঘটনার পরও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
আরও অভিযোগ রয়েছে, আশিকুর রহমান রনি বর্তমানে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চোরাচালানের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছেন। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে তিনি প্রভাব বিস্তার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার ছত্রচ্ছায়ায় বন্দরের স্কেলে ট্রাকপ্রতি ঘুষ আদায়ের একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় এবং সেই অর্থ সংগ্রহের দায়িত্বে ট্রাফিক পরিদর্শক জাবেদি বিল্লা রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেনাপোল স্থলবন্দরে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অপসারণ এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বন্দর ব্যবহারকারীরা।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com