
মেহেরপুর গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল হাসানকে ঘিরে টেন্ডারবিহীনভাবে সরকারি উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের অভিযোগ নিয়ে জেলায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। সম্প্রতি প্রায় আড়াই কোটি টাকার ১৯টি প্রকল্পে উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই কাজ সম্পাদনের অভিযোগ সামনে আসার পর নতুন করে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় ঠিকাদার, নির্মাণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তাসহ একাধিক সূত্রের দাবি, অভিযোগের পরিধি শুধু কয়েকটি প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে একটি অস্বচ্ছ কার্যপদ্ধতির মাধ্যমে উন্নয়নকাজ পরিচালনার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। সরকারি ক্রয়বিধির মূল উদ্দেশ্য হলো সর্বোচ্চ মানের কাজ নিশ্চিত করা এবং যোগ্য সকল ঠিকাদারের জন্য সমান অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য সীমিত রাখা, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়ন এবং কার্যাদেশ প্রদানে স্বচ্ছতার ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে।
জেলার কয়েকজন প্রবীণ ঠিকাদার জানান, অতীতে অধিকাংশ উন্নয়নকাজ ই-জিপি বা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হতো। ফলে কাজের গুণগত মান, ব্যয় ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছতা বজায় থাকত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু প্রকল্পে সাধারণ ঠিকাদারদের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে বলে তারা দাবি করেন।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রকল্পে কাজ শুরুর আগেই সম্ভাব্য ব্যয় ও প্রকৃত প্রয়োজনের মধ্যে অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর পূর্ণাঙ্গ মতামত গ্রহণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা জানান, কিছু ক্ষেত্রে তারা প্রকল্পের কাজ চলমান অবস্থায় বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। প্রকল্পের নকশা, অনুমোদিত ব্যয় বা বাস্তবায়ন পরিকল্পনা সম্পর্কেও তাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না বলে দাবি করেন তারা।
স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ, বিভিন্ন প্রকল্প এলাকায় স্থাপিত সাইনবোর্ডে কাজের ব্যয়, বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের নাম কিংবা প্রকল্প শেষ হওয়ার সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রকল্পের প্রকৃত তথ্য জানা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, সরকারি অর্থে পরিচালিত যেকোনো উন্নয়নকাজের তথ্য জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেই মৌলিক তথ্য সহজলভ্য নয়।
নির্মাণ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত না হলে অনিয়মের ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রতিযোগিতাহীন পরিবেশে ব্যয় বৃদ্ধি, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে সংস্কার ও মেরামত প্রকল্পে ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাই তুলনামূলক কঠিন হওয়ায় সেখানে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, কিছু প্রকল্পে একই ব্যক্তি বা একই গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন নামে কাজ পেয়েছে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। তবুও বিষয়টি নিয়ে জেলায় ব্যাপক আলোচনা চলছে।
ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, সরকারি উন্নয়নকাজ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় ব্যবসা, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। কিন্তু সীমিত সংখ্যক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কাজ কেন্দ্রীভূত হলে সেই সুফল বৃহত্তর অর্থনীতিতে পৌঁছায় না।
অভিযোগের জবাবে নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল হাসান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, জরুরি প্রয়োজনের কারণেই কিছু প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হয়েছে।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, কোন প্রকল্পগুলোকে জরুরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল, সেই সিদ্ধান্তের প্রশাসনিক ভিত্তি কী ছিল এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, যদি প্রকল্পগুলো প্রকৃত অর্থেই জরুরি হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট অনুমোদনপত্র, প্রশাসনিক নথি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত।
গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্ট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জানিয়েছেন, অভিযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত নন। তবে অভিযোগ পেলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বক্তব্যের পর স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিষয়টি শুধু মৌখিক অনুসন্ধানে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং প্রকল্পভিত্তিক নথি, ব্যয়, অনুমোদন, কার্যাদেশ এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত পরিচালিত হবে।
মেহেরপুরের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা যাই হোক না কেন, বিতর্ক নিরসনের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তথ্য প্রকাশ।
তাদের দাবি, কোন প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, কী প্রক্রিয়ায় কাজ দেওয়া হয়েছে, কারা কাজ বাস্তবায়ন করেছে এবং কাজের মান কেমন—এসব তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করা হলে অনেক প্রশ্নেরই উত্তর মিলবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকারি অর্থ জনগণের অর্থ। তাই সেই অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অথবা অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তা স্পষ্টভাবে জানানো—উভয় ক্ষেত্রেই দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
সব মিলিয়ে, মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগের কিছু প্রকল্পকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এখন শুধু একটি প্রশাসনিক বিতর্ক নয়; বরং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় পর্যায়ের সুশাসন নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com