
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক কাস্টমস কমিশনার একেএম নুরুজ্জামানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য, প্রভাব খাটানো এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের নানা অভিযোগ আলোচনায় রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, চাকরি জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি প্রশাসনিক প্রভাব, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে একাধিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এসব অভিযোগের কিছু বিষয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার নজরেও এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার শৈলঢুবি গ্রামে জন্মগ্রহণ করলেও একেএম নুরুজ্জামান বিভিন্ন সময় নিজেকে গোপালগঞ্জের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অতীত সরকারের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, যা বিভিন্ন বিতর্ক থেকে তাকে রক্ষা করতে ভূমিকা রেখেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০০৯ সালে ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস অঞ্চলে কর্মরত থাকাকালে তিনি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত ব্যক্তিদের চাকরির সুযোগ করে দেন। বিষয়টি নিয়ে সে সময় সমালোচনা তৈরি হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
পরবর্তীতে ২০১৩ সালে কমলাপুর আইসিডিতে কর্মরত অবস্থায় নিয়োগ বাণিজ্য এবং কথিত গুঁড়া দুধ কেলেঙ্কারির ঘটনায়ও তার নাম আলোচনায় আসে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত প্রশাসনিক বা বিচারিক সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও কয়েকটি স্থলবন্দরকেন্দ্রিক চোরাই পণ্য চক্রের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বন্ড কমিশনারেট, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর বিভিন্ন অনুসন্ধানে কিছু প্রতিষ্ঠানের শুল্ক ফাঁকি ও চোরাচালান কার্যক্রমের তথ্য উঠে এলেও সংশ্লিষ্ট অভিযোগে নুরুজ্জামানের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার বিষয়টি আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
২০১৭ সালের ২০ আগস্ট পুরান ঢাকার গুলশান আরা সিটি মার্কেট এলাকায় একটি কাভার্ড ভ্যান থেকে বিপুল পরিমাণ চোরাই পণ্য উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তে শতকোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির তথ্য উঠে আসে। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, ওই চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে নুরুজ্জামানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।
এছাড়া ২০১৩ সালে নারায়ণগঞ্জের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভুয়া নথি ব্যবহার করে পণ্য আমদানি ও চোরাচালানের অভিযোগে দায়ের করা মামলাগুলোর ক্ষেত্রেও তার নাম বিভিন্ন অভিযোগে উঠে আসে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় বা কোনো দণ্ডাদেশের তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমসে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিপুল আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময়ে বন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে কয়েকশ কোটি টাকার অনিয়ম সংঘটিত হয়।
এছাড়া পোর্ট থেকে কনটেইনার চুরি ও কাপড়ভর্তি চালান গায়েব হওয়ার ঘটনাতেও তার নাম অভিযোগের তালিকায় এসেছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, এসব মামলার কিছু এখনো বিচারাধীন রয়েছে।
২০২২ সালে ঢাকা পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনালকেন্দ্রিক একটি আলোচিত ঘটনায় সিগারেট ও মদবাহী কনটেইনার নিখোঁজের মামলায়ও তার নাম আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।
অভিযোগকারীদের দাবি, চাকরি জীবনে অর্জিত বৈধ আয়ের তুলনায় একেএম নুরুজ্জামানের সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি। তার পরিবারের নামে দেশ-বিদেশে বিপুল সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, অস্ট্রেলিয়ায় তার বাড়ি, গাড়ি এবং অন্যান্য সম্পদ রয়েছে। এছাড়া রাজধানীর অদূরে গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় তার স্ত্রী পাপিয়ার নামে একটি গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির দেখভাল করেন তার এক আত্মীয়।
বর্তমানে তিনি রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় বসবাস করেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে একেএম নুরুজ্জামানের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি প্রথমে ফোন রিসিভ করলেও পরিচয় দেওয়ার পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরবর্তীতে একাধিকবার ফোন ও বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ফলে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বিস্তারিত বক্তব্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আখতারুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তার কাছে তাৎক্ষণিক কোনো তথ্য নেই। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে বিস্তারিত জানা যেতে পারে।
অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন, বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় কিছু অভিযোগের তদন্ত দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে বিভিন্ন পর্যায় থেকে চাপ ও প্রভাবের অভিযোগও ছিল।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এ বিষয়ে বলেন, রাজস্ব খাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি মেনে নেওয়া হবে না। অতীতের অভিযোগগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনেক সময় অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য গণমাধ্যমকে জানানো হবে এবং কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
একেএম নুরুজ্জামানকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে নিয়োগ বাণিজ্য, শুল্ক ফাঁকি চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, চোরাচালান, কনটেইনার কেলেঙ্কারি, প্রশাসনিক প্রভাব খাটানো এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোই এখনো তদন্তাধীন বা বিচারাধীন।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, চলমান তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা উদঘাটিত হলে বিষয়টি সম্পর্কে সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে রাজস্ব প্রশাসনের জবাবদিহিতা ও সুশাসনের প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আসতে পারে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com