
বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) অ্যানেক্স ভবন সংস্কার ও মেরামতের নামে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে ভবনটিতে কোনো দৃশ্যমান সংস্কারকাজ হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি এখনও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এ ঘটনায় সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিসিসির ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অ্যানেক্স ভবনসহ বিভিন্ন ভবনের মেরামত ও সংস্কার বাবদ মোট ৭ কোটি ৪২ লাখ ৬ হাজার ৯৩ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত দুই বছরে অ্যানেক্স ভবন, নগর ভবন কিংবা সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন অন্য কোনো ভবনে উল্লেখযোগ্য সংস্কার বা রং করার কাজ হয়নি।
প্রকৌশল শাখার একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, বাজেটে যে বিপুল ব্যয় দেখানো হয়েছে, তার বাস্তব প্রতিফলন মাঠপর্যায়ে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে এই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অ্যানেক্স ভবনে একসময় তৎকালীন মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর কার্যালয়, হিসাব শাখা, পরিকল্পনা অনুমোদন শাখা, পরিচ্ছন্নতা শাখা, স্বাস্থ্য শাখা এবং একটি রেস্ট হাউস ছিল। ভবনের নিচতলায় জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়, বিদ্যুৎ অভিযোগ কেন্দ্র এবং একটি জামে মসজিদও ছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলে বিক্ষুব্ধ জনতা ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দিলে রাত পর্যন্ত আগুন জ্বলতে থাকে। এতে নিচতলা থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত পুরো ভবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও ভবনটি এখনও আগের মতোই পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
অ্যানেক্স ভবনের সামনের ফুটপাতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করা স্থানীয় বাসিন্দা মো. পলাশ বলেন, “আগুনের পর কিছু পোড়া মালামাল সরানো হয়েছিল। এরপর আর কোনো সংস্কারকাজ হতে দেখিনি।”
বিসিসির হিসাব শাখা সূত্র জানিয়েছে, প্রথমে নিজস্ব অর্থায়নে ভবন সংস্কারের জন্য ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। পরে সংশোধিত বাজেটে ভবন সংস্কার খাতে ব্যয় দেখানো হয় ৭ কোটি ৪২ লাখ টাকার বেশি।
হিসাবরক্ষক কাম বাজেট কর্মকর্তা মো. মইনুদ্দিন বলেন, “প্রকৌশল শাখার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বাজেটে এই ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কোথায় খরচ হয়েছে, সে বিষয়ে প্রকৌশল শাখাই বিস্তারিত বলতে পারবে।”
অন্যদিকে প্রধান প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবির দাবি করেন, “কিছু কিছু সংস্কারকাজ হয়েছে। আবার এমনও হতে পারে, কাগজে ভবন সংস্কার দেখানো হলেও অর্থ অন্য কোনো উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা হয়েছে।”
তবে এই বক্তব্য আরও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ, যদি অর্থ অন্য খাতে ব্যয় হয়ে থাকে, তাহলে বাজেটে তা ভবন সংস্কার ব্যয় হিসেবে দেখানো হলো কেন—এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।
বিসিসির প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বপন কুমার জানান, অ্যানেক্স ভবন পুনরায় ব্যবহারযোগ্য কি না তা যাচাই করতে ‘ডিজাইন ভেল্যু আর্কিটেক্ট অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিট্রোফিটিংয়ের মাধ্যমে ভবনটি ব্যবহারযোগ্য করা সম্ভব। তবে এতে অন্তত সাড়ে ৬ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এরপর কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা আমার জানা নেই।”
এদিকে বিসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল বারী বলেন, “বুয়েটের মূল্যায়ন অনুযায়ী ভবনটি ব্যবহার উপযোগী নয়। একে পরিত্যক্ত ঘোষণার প্রক্রিয়া চলছে।” তবে ভবন সংস্কার বাবদ সাড়ে ৭ কোটি টাকা ব্যয়ের বিষয়ে তিনি কোনো তথ্য জানেন না বলে দাবি করেন।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের বাজেটে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব অস্তিত্ব না থাকলে তা গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবন যখন এখনও ধ্বংসস্তূপ অবস্থায় পড়ে আছে, তখন সংস্কার ব্যয়ের নামে বিপুল অর্থ দেখানো জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি করাই স্বাভাবিক।
এ বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ব্যয়, অর্থের উৎস এবং অর্থ ব্যবহারের খাত নির্ধারণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে উল্লেখ্য, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত বা নিরীক্ষা ছাড়া কোনো অনিয়ম বা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত বলা যাবে না। ভবিষ্যতে তদন্ত ও নিরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টির প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com