
একসময় বন বিভাগের নার্সারিতে দৈনিক পাঁচ কেজি গমের বিনিময়ে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। সেই ব্যক্তি এখন ময়মনসিংহের ভালুকা অঞ্চলে বনভূমি দখল, অবৈধ সীমানা প্রাচীর নির্মাণ এবং প্রভাবশালীদের হয়ে জমি দখল ব্যবস্থাপনার অভিযোগে আলোচিত। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ‘বাউন্ডারি শহীদ’ নামে। তার প্রকৃত নাম শহীদুল ইসলাম শহীদ।
স্থানীয় বাসিন্দা, বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ভালুকা রেঞ্জের সংরক্ষিত বনভূমি দখলের বহু আলোচিত ঘটনার সঙ্গে শহীদুল ইসলামের নাম দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পক্ষে বনভূমি দখল, বাউন্ডারি নির্মাণ এবং জমি হস্তান্তরের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গফরগাঁওয়ের বাসিন্দা শহীদুল ইসলাম পরবর্তীতে ভালুকার হবিরবাড়ী এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। জীবনের শুরুতে বন বিভাগের নার্সারিতে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও বর্তমানে তার ও পরিবারের নামে বিপুল পরিমাণ জমি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, খামার এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিকানার তথ্য পাওয়া যায়।
অভিযোগ রয়েছে, সিডস্টোর বাজার এলাকায় তার মালিকানাধীন একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়া বনভূমি দখল করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রকল্প গড়ে তোলার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বনভূমি দখল ও সীমানা নির্ধারণে দক্ষতার কারণে শহীদুল ইসলাম এলাকায় ‘বাউন্ডারি শহীদ’ নামে পরিচিতি পান। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হয়ে বনভূমি দখল, বাউন্ডারি নির্মাণ এবং জমি দখল প্রক্রিয়ায় মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, বনভূমি দখলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তার একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক কাজ করত। বাধা দিলে ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে একাধিক বন মামলা দায়ের হলেও অনেক মামলার নথিতে নাম, পিতার নাম কিংবা ঠিকানায় অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ত্রুটির কারণে তিনি বিভিন্ন সময়ে আইনি সুবিধা পেয়েছেন।
তবে এসব ত্রুটির কারণ বা দায় কার, সে বিষয়ে বন বিভাগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শহীদুল ইসলাম এবং তার দুই ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান মামুন ও মাহমুদুল হাসান মুরাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় চাঁদাবাজি, দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মারধর, অস্ত্র আইনের লঙ্ঘন, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হত্যা চেষ্টা এবং অন্যান্য ফৌজদারি অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে এসব মামলার অনেকগুলো বিচারাধীন এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের দাবি, বিভিন্ন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় শহীদুল ইসলাম নিজের অবস্থানও পরিবর্তন করেছেন। একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে তিনি ভালুকা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। তার ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান মামুনও একটি রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে।
ময়মনসিংহ বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ভালুকা রেঞ্জের হবিরবাড়ী বিটের আওতাধীন কয়েক হাজার একর বনভূমির একটি বড় অংশ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দখলে রয়েছে। বন বিভাগের নথিতেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বনভূমি দীর্ঘদিন ধরে জবরদখলের মধ্যে রয়েছে।
স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, বনভূমির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দখলচক্র আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং এতে বন উজাড় ও পরিবেশগত ক্ষতি বাড়ছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে শহীদুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলেও বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ভালুকা রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার সাদিকুজ্জামান বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সংরক্ষিত বনভূমিতে নতুন কোনো স্থাপনা নির্মাণ হতে দেখেননি। বর্তমানে যেসব স্থাপনা রয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই পূর্বে নির্মিত হয়েছে।
ময়মনসিংহ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মো. নুরুল করিম বলেন, বনভূমি দখল ও ধ্বংসের অভিযোগে আলোচিত কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তবে স্থানীয় প্রভাব, জনবল সংকট এবং বিভিন্ন বাস্তব কারণে অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, শহীদুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলা রয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বনভূমি দখল, পরিবেশ ধ্বংস এবং প্রভাবশালী দখলচক্রের অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। তারা মনে করেন, প্রকৃত তথ্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সংরক্ষিত বনভূমি রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com