
দেশের অন্যতম বৃহৎ শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান হিসেবে সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক ডেপুটি গভর্নর এম খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জোবায়দুর রহমানের পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগের পর থেকেই ব্যাংকটির গ্রাহক, কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
নিয়োগ ঘোষণার পর ইসলামী ব্যাংকের কিছু গ্রাহক মতিঝিলে মানববন্ধনের উদ্যোগ নেন। এ সময় কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে বলে জানা গেছে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্যাংকপাড়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এম খুরশীদ আলমের অতীত কর্মজীবন নানা বিতর্ক ও অভিযোগে আলোচিত। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় দেশের ব্যাংকিং খাতে সংঘটিত বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও বিতর্কিত ঋণ কেলেঙ্কারির বিষয়ে তিনি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হন। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ব্যাংকিং সুবিধা ও ঋণসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো দাবি করেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে যেসব শীর্ষ কর্মকর্তা সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন, এম খুরশীদ আলম তাদের অন্যতম ছিলেন। পরে তিনি পদত্যাগ করেন বলে জানা যায়।
খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি তার বাংলাদেশ ব্যাংকের রংপুর অফিসে দায়িত্ব পালনকালীন সময়কে ঘিরে। ২০১৪ সালের মার্চ থেকে ২০১৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি রংপুর অফিসের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়ে বিভিন্ন সংস্কার, নির্মাণ ও আসবাবপত্র ক্রয়ের নামে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন ও নিরীক্ষা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, টেন্ডার প্রক্রিয়া এড়াতে বিভিন্ন কাজকে খণ্ড খণ্ড করে দেখানো হয় এবং অনুমোদনসীমার মধ্যে রেখে ব্যয় দেখানো হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রায় এক কোটি ২৯ লাখ টাকার বিভিন্ন কাজের মধ্যে অন্তত ৫৪ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে নির্মাণ ও সংস্কারকাজে প্রায় ২২ লাখ টাকার এবং আসবাবপত্র ক্রয়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকার বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠে আসে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও দাবি করেছে, কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবে কাজ না করেও বিল উত্তোলন করা হয়েছে। এমনকি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কিছু ব্যয়ও সরকারি খাত থেকে সমন্বয়ের অভিযোগ উঠে আসে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তীতে কোনো কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং তিনি পদোন্নতি লাভ করে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন।
ব্যাংকিং খাতের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এমন বিতর্কিত অতীত থাকা একজন ব্যক্তিকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তাদের মতে, দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীল করতে একটি স্বচ্ছ ও বিতর্কমুক্ত নেতৃত্ব প্রয়োজন।
অন্যদিকে আন্দোলনকারী গ্রাহকদের অভিযোগ, ব্যাংক খাতের অতীত বিতর্কের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসন করা হলে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তারা চেয়ারম্যান নিয়োগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনারও দাবি জানিয়েছেন।
তবে এম খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার প্রতিক্রিয়া মেলেনি। একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকেও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নিয়ে যেকোনো বিতর্ক গ্রাহক আস্থা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা জনসমক্ষে তুলে ধরা হলে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে।

