
দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজস্ব আহরণকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি প্রভাবশালী দালালচক্রের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকার পণ্য খালাস, শুল্ক নির্ধারণ এবং রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন শাখাকে কেন্দ্র করে বহিরাগতদের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যারা অনানুষ্ঠানিকভাবে ফাইল নিয়ন্ত্রণ, অর্থ লেনদেন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে আসছে।
জানা গেছে, গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনারের কাছে একদল ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি যৌথভাবে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগপত্রে কাস্টম হাউসের বিভিন্ন শাখায় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামের পাশাপাশি বহিরাগত কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন, ফাইল ব্যবস্থাপনা, প্রভাব খাটানো এবং মধ্যস্থতার অভিযোগ তোলা হয়।
অভিযোগকারীদের মধ্যে ছিলেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম, মোহাম্মদ নাছির, মো. কবির হোসেন, মোহাম্মদ রুবেল, মোহাম্মদ নবী, মোহাম্মদ সুমন, মোহাম্মদ আজিজ, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর ও ইলিয়াসসহ আরও কয়েকজন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাস্টম হাউসের বিভিন্ন শাখায় এমন অনেক ব্যক্তি নিয়মিত কাজ করেন, যাদের পরিচয় সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের কাছে স্পষ্ট নয়। অনেকেই নিজেদের কম্পিউটার অপারেটর, নথি সহকারী বা কর্মকর্তাদের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিয়ে অফিসের বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত থাকেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব ব্যক্তির একটি অংশ কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ, ফাইল তদারকি, নথি ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক দরকষাকষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কাস্টম হাউসের সেকশন-২, ৩, ৪, ৫(এ), ৫(বি), ৬, ৭(এ), ৭(বি), ৮(এ), ৮(বি), ৮(সি), ৮(ডি), ৯(এ/সি) ও ৯(বি)-সহ বিভিন্ন শাখাকে কেন্দ্র করে এমন অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বিভিন্ন শাখায় কর্মরত বা সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা একাধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘনিষ্ঠজন বা অনানুষ্ঠানিক সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এদের অনেকেই ঘুষ লেনদেন, ফাইল নিয়ন্ত্রণ, নথি ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারে ভূমিকা রাখেন।
তবে অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে সংশ্লিষ্টদের অনেকের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
অভিযোগে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে ‘নাস্তা খরচ’ শব্দবন্ধটি। অভিযোগকারীদের দাবি, ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি, শুল্কায়নে সুবিধা, নথি প্রক্রিয়াকরণ কিংবা প্রশাসনিক জটিলতা এড়ানোর নামে বিভিন্ন পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনকে অনেক সময় ‘নাস্তা খরচ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির মাধ্যমে এসব অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনকে অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
তবে প্রতিদিন কয়েক শত কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের যে দাবি অভিযোগকারীরা করেছেন, তার পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগে নাম আসা কয়েকজন ব্যক্তি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন, যা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
তালিকাভুক্ত একজন ব্যক্তি মোহাম্মদ জুয়েল বলেন, “এ ধরনের তালিকা আগেও হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। অফিসের লোকজনের সহযোগিতা ছাড়া বহিরাগতদের পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়।”
অন্যদিকে তালিকায় নাম থাকা মোহাম্মদ জিয়ান দাবি করেন, অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা সরাসরি অর্থ লেনদেন না করে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কাজ করেন।
অভিযুক্তদের মধ্যে আব্দুর রহিমের বক্তব্য আরও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি দাবি করেন, বহিরাগতদের সহযোগিতা ছাড়া কাস্টম হাউসের অনেক কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন।
তবে এসব বক্তব্যের সত্যতা বা অভিযোগগুলোর বাস্তবতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগকারীদের একজন মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, কাস্টম হাউসে বহিরাগত দালাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযোগ দেওয়া হলেও দৃশ্যমান পরিবর্তন খুব একটা দেখা যায়নি।
আরেক অভিযোগকারী মোহাম্মদ নাছিরের দাবি, অনেক বহিরাগত ব্যক্তি কর্মকর্তাদের পরিচয়ে কাজ করেন এবং তাদের দেখে কর্মকর্তা না দালাল—তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
অভিযোগকারী কবির হোসেনের মতে, কাস্টম হাউসে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয় তখনই, যখন কিছু কর্মকর্তা ও বহিরাগত ব্যক্তি একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেন।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার মুহাম্মদ সৈয়দুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, কাস্টম হাউসকে ঘিরে সক্রিয় দালালচক্র আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে বলে তার ধারণা। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে কাস্টম হাউসের মুখপাত্র ও অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, বহিরাগতদের সঙ্গে সিএন্ডএফ এজেন্ট বা ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক থাকতে পারে। কেউ অফিসিয়াল প্রয়োজনে অফিসে এলে তাকে প্রবেশে বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে অফিস স্টাফদের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা যোগাযোগ থাকতে পারে।
তবে কর্মকর্তাদের হয়ে বহিরাগতরা ঘুষের অর্থ লেনদেন করেন—এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
অভিযোগকারীদের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করলেও মূল কাঠামো এখনও অক্ষত রয়েছে। তাদের ভাষ্য, একাধিকবার লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়ার পরও দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দেশের রাজস্ব আহরণের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণ এবং দায়ীদের চিহ্নিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
বর্তমানে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং প্রশাসনের ব্যাখ্যার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—কাস্টম হাউসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ‘সমান্তরাল দালাল নেটওয়ার্ক’ কি শুধুই অভিযোগ, নাকি এর পেছনে রয়েছে বাস্তব কোনো কাঠামো?
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে ব্যবসায়ী সমাজ, সেবাগ্রহীতা এবং সংশ্লিষ্ট মহল।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com