
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক একের পর এক অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিতর্কের কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছে। ঋণ বিতরণ ও সঞ্চয় হিসাব ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেই এবার জনবল নিয়োগকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের জালিয়াতি ও ঘুষ বাণিজ্যের তথ্য সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগের কার্যকর তদন্ত ও প্রতিকার না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ২৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত অফিস সহায়ক পদে ৪৯২ জন নিয়োগের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধভাবে ঘুষ আদায় ও জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ডাচ-বাংলা ব্যাংক পিএলসি’র আটিবাজার শাখায় পরিচালিত “এনাম ওয়্যারস” নামে একটি হিসাবের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে মোট ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থ নিয়োগে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে আদায় করা হয়। তদন্তে জড়িতদের একজন এনামুল হক বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত কমিটির কাছে এ বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ডাচ-বাংলা ব্যাংকের কর্মকর্তা ও অভিযুক্ত চক্রের সদস্য এনামুল হক দাবি করেছেন, হিসাব থেকে উত্তোলিত অর্থ তিনি পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কর্মকর্তা জিন্নাত জাহান তুলির কাছে হস্তান্তর করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত দলের পক্ষ থেকে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে পাঠানো একটি কৈফিয়ত নোটিশেও অর্থ হস্তান্তরের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে জিন্নাত জাহান তুলি অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে তার কথোপকথনের যে অডিও রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছে, তা কৃত্রিমভাবে তৈরি বা ‘ক্লোনড’ অডিও হতে পারে।
নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে বরগুনার চাকরিপ্রার্থী সোহাগ হাওলাদার সম্পর্কেও বেশ কিছু তথ্য উঠে এসেছে। অনুসন্ধান সূত্রে জানা যায়, তিনি নিজের মামা পরিচয়ে এক ব্যক্তির সঙ্গে ঢাকায় এসে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পঙ্কজ তালুকদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং নিয়োগ-সংক্রান্ত সুবিধার জন্য অর্থ লেনদেন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রার্থীদের ‘অগ্রদূত প্রকাশনী’র জব সলিউশন বই অনুসরণ করে উত্তরপত্র পূরণের সুযোগ করে দেয়। এ ঘটনায় এক চাকরিপ্রার্থীর স্বামীকে দ্রুত ঘুষের টাকা পরিশোধের তাগিদ দিয়ে করা একটি ফোনালাপের রেকর্ডও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
তবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে সোহাগ হাওলাদার কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, নিয়োগ বাণিজ্য পরিচালনাকারী চক্রটির সঙ্গে প্রভাবশালী কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান ব্যাংক কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। অভিযোগে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জামিনুর রহমান, আল্লামা তানহাসহ কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে।
সূত্রটির দাবি, একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চাকরিপ্রার্থী সংগ্রহ করে এবং প্রভাব খাটিয়ে তাদের চাকরি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিত। এমনকি দুদকের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে চক্রটির যোগাযোগ থাকার অভিযোগও রয়েছে।
এ কারণে জিন্নাত জাহান তুলির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি অনুসন্ধান পূর্ববর্তী সরকারের আমলে কার্যকর অগ্রগতি ছাড়াই বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
অনুসন্ধান সূত্রে আরও জানা যায়, মাঠপর্যায়ে অর্থ সংগ্রহ, যোগাযোগ রক্ষা এবং পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পঙ্কজ তালুকদার, তার পরিবারের সদস্যরা, কর্মকর্তা জিন্নাত জাহান তুলি এবং ডাচ-বাংলা ব্যাংকের কর্মকর্তা এনামুল হক।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com