
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গাজীপুর ও ময়মনসিংহ জেলার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে পুলিশ কর্মকর্তা কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার নগর বাথান গ্রামের বাসিন্দা কামাল হোসেনের নামে-বেনামে রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, শেরপুর ও রাজবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাড়ি, জমি, রিসোর্ট, মাছের খামার, সঞ্চয়পত্র এবং একাধিক গাড়ি রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব সম্পদের মোট মূল্য শতকোটি টাকারও বেশি। তার স্ত্রী, কন্যা, ভাই এবং মা-বাবার নামেও বিভিন্ন সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কামাল হোসেন ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) হিসেবে শেরপুর জেলায় কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৫ সালে গাজীপুরের টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি হিসেবে যোগদান করেন। দায়িত্ব পালনকালে আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে চাঁদাবাজি, অনিয়ম এবং বিভিন্ন প্রভাব খাটিয়ে বিপুল অর্থের মালিক হন তিনি। গাজীপুরের কয়েকজন ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তার সঙ্গে তার আর্থিক ও ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। এসব ব্যবসা পরিচালনায় তার স্ত্রী উম্মে রোমান এবং ছোট ভাই ময়নুল ইসলামের সম্পৃক্ততার কথাও বলা হয়েছে।
২০১৯ সাল পর্যন্ত টঙ্গী পূর্ব থানায় দায়িত্ব পালনের পর ২০২১ সালে কামাল হোসেন ময়মনসিংহের ভালুকা থানার ওসি হিসেবে যোগ দেন। পরে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তাকে ত্রিশাল থানায় বদলি করা হয়। ওই সময় নৌকার পক্ষে প্রচারণায় জড়িত থাকার অভিযোগে নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দায়ের হলেও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নিজের পছন্দের থানায় দীর্ঘদিন ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন কামাল হোসেন। বিশেষ করে টঙ্গী পূর্ব, ভালুকা ও ত্রিশাল থানায় দায়িত্ব পালনকালে তার সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে তার স্ত্রী উম্মে রোমানের নামে রাজধানীর উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরে একটি বিলাসবহুল আটতলা বাড়ি রয়েছে। এছাড়া ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাটের মালিকানার তথ্য পাওয়া গেছে। রাজবাড়ীর নগর বাথান এলাকায় ‘ঝিলিক মঞ্জিল’ নামে একটি বৃহৎ ডুপ্লেক্স বাড়িও রয়েছে তাদের।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গাজীপুরের হোতাপাড়া ও মণিপুর এলাকায় কয়েক একর জমি, শেরপুরের শ্রীবরদী ও গোপালবাড়ি এলাকায় এবং রাজবাড়ীতে পরিবারের সদস্যদের নামে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি ক্রয় করা হয়েছে। এছাড়া গাজীপুরে বেনামে একটি রিসোর্ট পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।
শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলায় প্রায় ছয় একর জমিতে একটি মাছের খামার গড়ে তোলা হলেও সেখানে বাস্তবে মাছ চাষ না করে আয়কর নথিতে আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সম্পদের তালিকায় রয়েছে একাধিক ব্যক্তিগত গাড়িও। অভিযোগ অনুযায়ী, পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন দামী গাড়ি ব্যবহার করলেও সেগুলোর নিবন্ধন বিভিন্ন ব্যক্তির নামে করা হয়েছে। পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র ও এফডিআরের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের তথ্যও পাওয়া গেছে।
এদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর দেশের পুলিশ সদস্যরা যখন নিরপেক্ষতা বজায় রাখার অঙ্গীকার করছেন, তখনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের সঙ্গে কামাল হোসেনের ঘনিষ্ঠতার বিভিন্ন ছবি নিয়ে আলোচনা সৃষ্টি হয়।
বর্তমানে কামাল হোসেন টাঙ্গাইল জেলার বঙ্গবন্ধু সেতু (পূর্ব) নৌফাঁড়িতে কর্মরত রয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে কামাল হোসেন বলেন, “আমার এক নিকটাত্মীয় দীর্ঘদিন ধরে আমার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ করে বেড়াচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। আমি সব সময় সততা ও ন্যায়ের পথে চলার চেষ্টা করেছি।”
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল নৌপুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) সোহেল রানা বলেন, “তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে অথবা কেউ অভিযোগ করলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com